লেখকঃ সাইফ সোহেল
একটি ছোট্ট মেয়ে সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে বলে, ‘মা, ফিরে আসব।’ একজন মায়ের কাছে এই ফিরে আসাটুকুই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। অথচ বাংলাদেশে আজ অনেক মা-বাবার মনে একটাই প্রশ্ন আমার মেয়েটি নিরাপদে ফিরবে তো?
১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এই দিনে আমরা মেয়েদের স্বপ্ন, শিক্ষা, অধিকার আর সুন্দর ভবিষ্যতের কথা বলি। কিন্তু গত দুই বছরের ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সংবাদপত্রভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৫১৬ জন এবং ২০২৫ সালে ৭৮৬ জন নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫৪৩ জনই ছিল কন্যাশিশু। ২০২৪ সালে ৭৭ কন্যাশিশুসহ ৫২৮ জন নারী ও মেয়েশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন।
২০২৬ সালেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম আট মাসে ২৪০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর ২২ জন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে আরও ৩০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের এবং ১৩ জন কন্যাশিশু হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
আর এই কন্যাশিশু দিবসের ঠিক আগমুহূর্তে কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আবারও আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ৮ অক্টোবর ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে এক অটোরিকশাচালক তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করেন। ১০ অক্টোবর অভিযুক্ত চালক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
একবার ভাবুন, একটি মেয়ে শুধু বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল। অথচ সে আর কোনো দিন ফিরবে না। তার পরিবারের কাছে কন্যাশিশু দিবসের শুভেচ্ছা কিংবা আমাদের উন্নয়নের গল্পের মূল্যই বা কতটুকু?
২০২৫ সালে মাগুরার আট বছরের শিশুটির ওপর নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আমরা প্রতিবাদ করেছি, বিচারের দাবি তুলেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবাদের পর আমরা কতটা বদলেছি?
একটি শিশুর তো রাজনীতি বোঝার কথা নয়, বিচারব্যবস্থা নিয়ে ভাবার কথা নয়। তার পৃথিবী হওয়ার কথা স্কুল, খেলনা, বন্ধু আর স্বপ্নে ভরা। অথচ আমাদের সমাজে অনেক শিশুকে খুব অল্প বয়সেই ভয় চিনতে হচ্ছে।
আমরা মেয়েদের বলি সাবধানে চলতে, সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরতে, অপরিচিত কাউকে বিশ্বাস না করতে। কিন্তু আমরা কি আমাদের ছেলেদের যথেষ্ট শেখাচ্ছি—একটি মেয়েকে সম্মান করতে, তার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে?
দেশে সরকার বদলায়, নীতি বদলায়, উন্নয়নের গল্প বদলায়। আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু একটি শিশুর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকলে সেই উন্নয়নের অর্থ কী? শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ।
একটি কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়, কোনো বিশেষ সুবিধাও নয়—এটি তার জন্মগত অধিকার।
আজ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে শুধু শুভেচ্ছা আর রঙিন পোস্টার নয়, আমাদের নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখা উচিত—আমরা কি সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করছি, যেখানে আমাদের মেয়েরা ভয় ছাড়া বড় হতে পারবে?
কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে আছে একটি মুখ, একটি নাম, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নগুলো রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
আমাদের মেয়েরা আর কত দিন শুধু পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে? আর কত মায়ের বুক খালি হলে আমরা বুঝব—কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত মানবিক দায়?
