ফোরটিন ডেস্ক : ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকের দাবি, ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই হামলা চালানো হয়েছে। একইভাবে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকায় প্লট ও ভবন নির্মাণের কাজেও চাঁদা দাবি এবং হুমকির অভিযোগ করেছেন একাধিক ব্যবসায়ী ও জমির মালিক।
এসব ঘটনায় কোথাও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে আছে, কোথাও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। ফলে চাঁদাবাজি ও দখল ঠেকাতে সরকারের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কেরানীগঞ্জে আবাসন প্রতিষ্ঠানের অফিসে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ
ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে আফসানা হাউজিং নামে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা ও মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মো. নাসিরের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববার বেলা ১১টা ২৬ মিনিটের দিকে একটি ছোট ট্রাক নিয়ে একদল যুবক কার্যালয়ে আসে।
কার্যালয়টি তখন ফাঁকা ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৩০ জন যুবক ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন কক্ষের দরজা ভাঙচুর করে। প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজে রামদা ও লাঠিসোঁটা হাতে কয়েকজনকে কার্যালয়ে ভাঙচুর করতে এবং আসবাবপত্র বাইরে নিয়ে যেতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা সোফাসেট, এয়ারকন্ডিশনার, টেলিভিশন, গিজারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার নাসিরের দাবি, লুট হওয়া সম্পদের মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। তাঁর ভাষ্য, ব্যবসা পরিচালনার জন্য ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। সেই টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক সজীব ব্যাপারী ঘটনার পরদিন ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় মামলা করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে।
তবে মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
মিরপুরে নির্মাণকাজে চাঁদার দাবি, বন্ধ প্রকল্প
কেরানীগঞ্জের ঘটনার বাইরে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকাতেও চাঁদা দাবি ও নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন জমি ও ভবনের মালিকেরা।
রূপনগর এলাকায় চার কাঠার একটি প্লট কিনেছিলেন ব্যবসায়ী মোদাচ্ছের হোসেন। দীর্ঘদিন ফাঁকা পড়ে থাকা প্লটটিতে প্রায় চার মাস আগে ভবন নির্মাণের জন্য পাইলিংয়ের উদ্যোগ নেন তিনি।
মোদাচ্ছের হোসেনের অভিযোগ, কাজ শুরু করার পর বিভিন্ন সময়ে একই গোষ্ঠীর লোকজন তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে। একপর্যায়ে পাঁচ লাখ টাকা না দিলে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।
চাঁদার দাবিতে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণের জন্য গ্রাম থেকে জমিজমা বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু চাঁদা দিয়ে কাজ চালাতে রাজি নন তিনি। হুমকি পেলেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তাঁর অনীহা রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, অভিযোগ করেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যাবে না।
অর্ধশত প্লট ও ভবনে চাঁদা দাবির অভিযোগ
রূপনগরের সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকায় ভবন নির্মাণের কাজ নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ডেফোডিল হোমস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দশতলা ভবনের চারটি তলার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবি ও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগে প্রকল্পের কাজ একাধিকবার বন্ধ রাখতে হয়েছে। তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
আব্দুল মান্নান জানান, ভবনটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ করে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে এবং চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ ঘটনায় মামলা করেছেন বলেও জানান তিনি। তবে তাঁর অভিযোগ, মামলা করার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। তাঁর দাবি, চাঁদাবাজদের সঙ্গে স্থানীয় থানা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কারও কারও সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকার প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ির মালিকদের একটি সংগঠনও চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগ তুলেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নির্মাণকাজের সময় চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শ্রমিকদের হুমকি, মারধর এবং কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
সংগঠনটির সহসভাপতি মো. তাওহীদুল ইসলাম তালুকদারের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এলাকায় এ ধরনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে এবং সম্প্রতি তা বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রায় ৫০টি প্লট বা ভবনের ক্ষেত্রে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে।
এগুলো সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ। প্রতিটি ঘটনার সত্যতা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা পৃথক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, ডিএমপির বক্তব্য
চাঁদাবাজি ও নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ নাকচ করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের ডিসি আকতার হোসেন। তাঁর বক্তব্য, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অপরাধের ঘটনায় মামলা করার প্রয়োজন হলে মামলা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার কথাও জানান তিনি।
তবে অভিযোগকারীদের বক্তব্য ও পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে নির্দিষ্ট ঘটনাগুলোর তদন্ত, মামলা-পরবর্তী অগ্রগতি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপের তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁদাবাজি-দখলের পেছনে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের অভিযোগ
চাঁদাবাজি, দখল ও হামলার অভিযোগে বিভিন্ন ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মীর নাম অভিযোগে আসায় বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কেরও কারণ হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হকের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার প্রভাব অপরাধীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করলে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
তাঁর ব্যাখ্যা, ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হতে পারে। সেই প্রবণতা থেকে শক্তি প্রয়োগ, অন্যের সম্পত্তি দখল কিংবা চাঁদাবাজির মতো অপরাধ ঘটতে পারে।
তৌহিদুল হক মনে করেন, অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু বহিষ্কার বা দলীয় শাস্তি যথেষ্ট নয়; অপরাধের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
সরকার কি অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে?
চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকার অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে না। তবে সরকারি দলের কেউ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, এমন অভিযোগও তিনি সরাসরি উড়িয়ে দেননি।
তাঁর বক্তব্য, সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে। সরকার বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন বলেও জানান তিনি।
তবে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ কমাতে সরকারের সচেতনতার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
কেরানীগঞ্জে আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে লুটপাটের অভিযোগ, মিরপুরে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে থাকা এবং রূপনগরে বহু প্লট ও ভবনে চাঁদা দাবির অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এসব অভিযোগের প্রতিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, মামলা গ্রহণ ও তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগে দলীয় নেতাকর্মীদের নাম উঠে এলে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তা বা সহযোগিতার অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সরকার অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে না বলে যে অবস্থান জানিয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের। কারণ ব্যবসা, আবাসন নির্মাণ ও সাধারণ মানুষের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শুধু আশ্বাস দিয়ে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন।
