ফোরটিন ডেস্ক : জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের নিয়োগ নিয়ে স্বার্থের সংঘাত ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরে আইন কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্থাটির নৈতিকতা বিধি লঙ্ঘিত হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা। তবে বাংলাদেশের সরকার এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তর বলছে, নিয়োগটি জাতিসংঘের প্রচলিত নিয়ম অনুসারেই হয়েছে।
নেত্র নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইন্টেগ্রিটি বিভাগের অধ্যাপক এলিজাবেথ ডেভিড-ব্যারেট বলেন, এ নিয়োগ জাতিসংঘের নৈতিকতা বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা এবং স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের সম্ভাব্য উদাহরণ বলে মনে হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সাধারণ পরিষদের সভাপতির মুখপাত্র মেলিসা সামার্স বলেন, জাতিসংঘ সচিবালয়ের কোনো কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা সভাপতির নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, খলিলুর রহমান ৮ সেপ্টেম্বর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, আর জাইমা রহমানের নিয়োগ হয় ১৫ জুলাই।
তবে খলিলুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ২ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ জাইমার নিয়োগের প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে তিনি নির্বাচিত হন। জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, নতুন নির্বাচিত সভাপতিরা দায়িত্ব গ্রহণের আগেই নিজেদের দপ্তরের জন্য কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকেন।
খলিলুর রহমান জাইমা রহমানের নিয়োগের সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা রেখেছিলেন কি না, তা স্পষ্ট করতে বলা হলে সামার্স আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এক বছরের চুক্তিভিত্তিক এ পদটি জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট থেকে অর্থায়ন করা হয়। পদটিতে প্রাথমিক বার্ষিক বেতন প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ সরকারের দাবি, জাইমা রহমান নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতেই চাকরিটি পেয়েছেন। এ নিয়োগে সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না।
স্বার্থের সংঘাত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য। অন্যদিকে, সভাপতির দপ্তরে নিয়োগ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমান। এ সম্পর্কের কারণে নিয়োগটি স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এলিজাবেথ ডেভিড-ব্যারেট বলেন, খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সেই প্রধানমন্ত্রীর মেয়েকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করে। তাঁর মতে, এ নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর আনুকূল্য পাওয়ার চেষ্টা কিংবা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ দেখা দিতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও এ নিয়োগকে স্বার্থের সংঘাতের স্পষ্ট ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের নিয়োগের মধ্যে সম্পর্কটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির নৈতিকতা বিধিতে ব্যক্তিগত বা নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গে সভাপতির দপ্তর কিংবা জাতিসংঘের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে অযৌক্তিক বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে মনে হতে পারে, এমন আচরণ থেকেও বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।
২০১৬ সালে সাধারণ পরিষদ এ নৈতিকতা বিধি গ্রহণ করে। এর আগে সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি জন অ্যাশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। অভিযোগের অর্থের বড় অংশ তাঁর ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের সভাপতির মেয়াদের সময় গ্রহণ করা হয়েছিল বলে জানানো হয়।
২ জুন নির্বাচিত হওয়ার পর খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সনদ এবং সভাপতির আচরণবিধি সম্পূর্ণভাবে অনুসরণের অঙ্গীকার করেছিলেন।
নিয়োগ নিয়ে সরকারের বক্তব্য
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জাইমা রহমানের নিয়োগের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নজমুল হক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বিদ্যমান নিয়ম ও প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, জাইমা রহমান নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে পি-৩ পদে নিয়োগ পেয়েছেন। এ পদে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন এবং তাঁর পেশাগত প্রোফাইল সেই যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ নিয়োগে সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না।
জাতিসংঘে পি-৩ একটি মধ্যম পর্যায়ের পেশাগত পদ। সংস্থাটির প্রকাশিত মানবসম্পদ নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা সমমানের যোগ্যতা থাকলে সাধারণত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা এবং স্নাতক ডিগ্রি থাকলে সাত বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। খণ্ডকালীন কাজের অভিজ্ঞতা কাজের ঘণ্টার অনুপাতে গণনা করা হয়। আর কাজের সময়ের তথ্য না থাকলে ফ্রিল্যান্স বা স্বনিয়োজিত কাজের অভিজ্ঞতা ৫০ শতাংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জাইমা রহমান আইন বিষয়ে ডিগ্রিধারী এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বার-এ আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাঁর বার কোর্সকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমতুল্য ধরা হলে পি-৩ পদের জন্য পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
নেত্র নিউজের পর্যালোচনা করা তাঁর লিংকডইন প্রোফাইলে ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত কাজের তথ্য রয়েছে, যা দুই বছরেরও কম সময়ের। এর মধ্যে নিউক্লিয়াস লিগ্যাল অ্যাডভাইস সেন্টারে ১১ মাস পূর্ণকালীন অ্যাকসেস কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্ট্র্যান্ড চেম্বার্সে পাঁচ মাস খণ্ডকালীন আইনি সহকারী হিসেবে কাজ এবং ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ফ্রিল্যান্স আদালত-সংক্রান্ত কাজের তথ্য রয়েছে।
তবে জাতিসংঘের সভাপতির দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জীবনীতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে আইনি পরামর্শ ও জনসংযোগের কাজসহ আরও কিছু অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কাজের সময়কাল ও বিস্তারিত তথ্য সেখানে দেওয়া নেই। ঢাকার আইন প্রতিষ্ঠান সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে তিনি কখন এবং কত দিন সেখানে কাজ করেছেন, তা জানাতে রাজি হয়নি।
জাইমা রহমান ২০০৮ সাল থেকে বিদেশে বসবাস করছিলেন এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ঢাকায় ফেরেন। ফলে তাঁর আগের কর্মজীবনের সময়কাল ও অন্যান্য অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তথ্য ছাড়া পি-৩ পদের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা তিনি পূরণ করেছেন কি না, তা প্রকাশ্য তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির মুখপাত্র সামার্স জানান, জাতিসংঘের অপারেশনাল সাপোর্ট বিভাগের ওয়ান এক্সিকিউটিভ অফিস পদটির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুযায়ী জাইমা রহমানের যোগ্যতা যাচাই করেছে। তাঁর দাবি, নিয়োগটি জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত রীতি ও বিধিবিধান মেনেই হয়েছে।
তবে আইন কর্মকর্তা পদটির নিয়োগের শর্তাবলি বা টার্মস অব রেফারেন্স প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সভাপতির দপ্তর। জাইমা রহমানের জাতিসংঘের ইমেইল ঠিকানায় পাঠানো প্রশ্নেরও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক নিয়োগের ক্ষমতা মহাসচিবের নামে প্রয়োগ করা হলেও, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবনবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মিত বাজেটের আওতায় আটটি অস্থায়ী পদে সভাপতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সভাপতির দপ্তরের ওয়েবসাইটেও এ অধিবেশনের জন্য নিয়মিত বাজেটের অর্থায়নে আটটি পদের উল্লেখ রয়েছে। জাইমা রহমান এর একটি পদে নিয়োগ পেয়েছেন।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নির্বাচিত সভাপতিরা দায়িত্ব গ্রহণের আগেই নিজেদের দল গঠনে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করেন।
এ অবস্থায় জাইমা রহমানের নিয়োগে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন কে দিয়েছেন, তার পাশাপাশি তাঁকে নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত ছিলেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা নিয়োগটিকে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত করলেও সরকার বলছে, তিনি নিজ যোগ্যতাতেই পদটি পেয়েছেন। প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগের সিদ্ধান্তে খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত ভূমিকা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
