ফোরটিন ডেস্ক : ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য বিনা মূল্যে বিতরণের প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্র ঘিরে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য পরিবর্তন, একাধিক দরপত্রে প্রতিযোগিতার ঘাটতি, সিন্ডিকেট করে কাজ ভাগাভাগি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপানো শেষ না হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সব বই সরবরাহ করতে পারবে না ২৬টি ছাপাখানা। এদিকে দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) তথ্য সংগ্রহে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তবে ২৫০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা, সংশ্লিষ্টদের দায় এবং সরকারি অর্থের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
নভেম্বরের মধ্যে সব বই সরবরাহের নির্দেশ
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে কয়েকটি ছাপাখানার মালিককে ডেকে পাঠান।
বৈঠকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। মন্ত্রী আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত সব পাঠ্যবই সরবরাহের নির্দেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ডিসেম্বর মাসে চীন থেকে বই ছাপিয়ে আনার প্রস্তুতি রাখার কথাও তিনি বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান রুবেল বৈঠকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশ বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানান। বাকি ৫ শতাংশ বইয়ের জন্য বাড়তি সময় চাওয়া হলে মন্ত্রী শতভাগ বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না কেন, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা চান বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বৈঠকে একটি ছাপাখানা থেকে নিম্নমানের বই পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন মন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে এমনটি হবে না বলে অঙ্গীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ছাপানোর অগ্রগতি নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে পিছিয়ে
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৫০ শতাংশ পাঠ্যবই ছাপানোর লক্ষ্য থাকলেও সংশ্লিষ্ট বুধবার পর্যন্ত ছাপার কাজ ৩০ শতাংশের নিচে ছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত অগ্রগতির তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ পিছিয়ে ছিল ছাপাখানাগুলো।
বিপুলসংখ্যক বই ছাপানো, মান যাচাই এবং সারা দেশে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে এ পরিস্থিতি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষ সময়ে বই ছাপানোর কাজ শেষ করতে তাড়াহুড়ো হলে কাগজের মান ও মুদ্রণের গুণগত মান যাচাইয়ের সুযোগ কমে যেতে পারে। তবে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দরপত্রে একক দর জমার হার ৬৬ শতাংশের বেশি
দরপত্রের তথ্য বিশ্লেষণের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপানোর জন্য মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে মাত্র একটি করে দরপত্র জমা পড়ে। অর্থাৎ মোট দরপত্রের ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে একক দরপত্র ছিল।
এ ছাড়া ১৩টি দরপত্রে দুটি করে এবং দুটি দরপত্রে তিনটি করে দরপত্র জমা পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে সহস্রাধিক ছাপাখানা থাকার কথা উল্লেখ করে এ পরিস্থিতিতে দরপত্রের প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে একক দরপত্র জমা পড়া নিজে থেকেই অনিয়ম বা দুর্নীতির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। দরপত্রের শর্ত, অংশগ্রহণের সুযোগ, মূল্য নির্ধারণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপানোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরে প্রতি ফর্মার গড় দর ৩ টাকা ৫৪ পয়সা এবং মাধ্যমিক স্তরে ৩ টাকা ৩২ পয়সা হয়েছে। তুলনায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক স্তরে প্রতি ফর্মার গড় দর ছিল ৩ টাকা ৪৪ পয়সা এবং মাধ্যমিক স্তরে ২ টাকা ৩১ পয়সা।
দুই শিক্ষাবর্ষের দরের এই পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কাগজের দাম, কাজের পরিমাণ, মুদ্রণসংক্রান্ত শর্ত এবং অন্যান্য ব্যয়ের পার্থক্য যাচাই না করে শুধু দরের তুলনা থেকে অতিরিক্ত ব্যয় বা দুর্নীতির পরিমাণ নিশ্চিত করা যায় না।
প্রাক্কলিত দর পরিবর্তন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, দরপত্র কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় প্রাক্কলিত মূল্য পরিবর্তন করা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, দরপত্রের প্রাথমিক প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁস হওয়ার পর কয়েকজন ঠিকাদার মূল্য বাড়ানোর জন্য চাপ দেন এবং পরে প্রাক্কলিত দর বৃদ্ধি করা হয়।
তাদের অভিযোগ, এরপর ঠিকাদারদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেছেন, দরপত্র প্রকাশের পর নতুন করে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণের সুযোগ নেই এবং এ ধরনের পরিবর্তন বিধিবহির্ভূত। তিনি বিষয়টির প্রতিকার দাবি করেছেন।
প্রতিবেদনে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫-এর বিধি ৪৪(২)-এর উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, যেমন বাস্তবসম্মত প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দর বেশি হলে বা কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব দেখা গেলে, দরপত্র বাতিলের সুযোগের কথা রয়েছে।
তবে প্রাক্কলিত দর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ঠিক কোন বিধি কীভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসায়িক অংশীদারকে ঘিরে অভিযোগ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত মো. জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসায়িক অংশীদার এবং একটি ছাপাখানার মালিকের বিরুদ্ধে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর পরিবারের চারটি ছাপাখানা ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্যাদেশ পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ, দরপত্র জমা এবং কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করেছে। সরকার পরিবর্তনের পরও একই পরিবারের ছাপাখানাগুলো বেশি কাজ পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও অন্য ছাপাখানার মালিকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, তাঁর পরিবারের প্রতিষ্ঠান এবং এনসিটিবির কর্মকর্তাদের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কার্যাদেশ, দরপত্র মূল্যায়ন, মালিকানার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠানের বেশি কাজ পাওয়া মাত্রই দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে সিআইডির মামলা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে মো. জাহাঙ্গীর আলম বিকাশের ডিস্ট্রিবিউশন ফ্র্যাঞ্চাইজি নেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।
প্রতিষ্ঠানটি এবং জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা, অর্থের উৎস এবং অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ওই কোম্পানির ব্যবসায়িক অংশীদার হন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাহাঙ্গীর আলম যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের সঙ্গে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে অনিয়মের কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা নথি ও তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
দুদকের অভিযান, নথি সংগ্রহের দাবি
দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু নথি সংগ্রহ করেছে দুদক বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের পরদিন এনসিটিবি অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রেস মালিকদের ডেকে প্রথম পর্যায়ের প্রাক্কলিত দর বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না, এমন বক্তব্য প্যাডে লিখে দিতে বলে। এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফখরুল মাওলার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথি, বৈঠকের কার্যবিবরণী এবং এনসিটিবি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। দুদকের অভিযান ও নথি সংগ্রহ তদন্তের অংশ; এগুলো নিজেরাই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়।
সময়মতো মানসম্মত বই সরবরাহের দাবি
বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। ছাপানোর কাজে বিলম্ব হলে শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের শুরুতে বই পৌঁছানো ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে দরপত্রে অনিয়ম বা অপ্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণের অভিযোগ সত্য হলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।
এ অবস্থায় দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য কেন পরিবর্তন করা হয়েছিল, কোন ভিত্তিতে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, একক দরপত্রের ক্ষেত্রে কীভাবে মূল্যায়ন হয়েছে এবং অভিযোগে উল্লেখিত অর্থের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দুদকের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত বই নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
