লেখকঃ অদিতি করিম
দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি অনুসরণের কথা বলছে সরকার। অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নিয়োগ ও পদায়নে অনিয়ম, উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগগুলোর মধ্যে বিদেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার এবং বিভিন্ন নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের দাবিও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়।
২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুদকের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়ন, স্থানীয় সরকার খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদায়ন ঘিরে অর্থ লেনদেনের দাবিও রয়েছে।
অভিযোগে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ, টেন্ডার থেকে কমিশন গ্রহণ এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসক পদায়নেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
দুদক এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করেছে। তবে অভিযোগে উল্লেখ করা প্রতিটি অঙ্ক ও ঘটনার সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্তের ফল এবং সংশ্লিষ্ট নথি গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ
আসিফ মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রীর বিদেশে সম্পদ অর্জন, ব্যাংক হিসাব এবং আর্থিক লেনদেন নিয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে দুদক।
১৭ সেপ্টেম্বর দুদক বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাঁদের দেশি-বিদেশি সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির তথ্য চায়। পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে সম্পদ কেনা, বিনিয়োগ ও অর্থপাচারের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্যও তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদ অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দুদকও জানিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং জমে থাকা অভিযোগগুলো আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
অন্য সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আরও কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ লিখিতভাবে জমা পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কেনা, দুবাইয়ে ফ্ল্যাট কেনা এবং পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ অর্জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে উল্লিখিত সম্পদ কেনার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত নথি এখানে পাওয়া যায়নি। একইভাবে, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দুদক আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্যও পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।
জনস্বার্থে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দুদকের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে থাকলে তার বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলা সুপারিশের প্রসঙ্গ
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধেও বিটিসিএলের ফাইভ-জি উপযোগীকরণ প্রকল্প ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে দুদকের পদক্ষেপের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে মামলা দায়েরের পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে হালনাগাদ ও নিশ্চিত তথ্য ছাড়া মামলাটি এখনো হয়নি বা তদন্ত সম্পূর্ণ স্থবির, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের নামে থাকা আমানত প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়ে ৮৩৪ দশমিক ১৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৮৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ।
তবে এই পরিসংখ্যানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকসংশ্লিষ্ট অর্থ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কোন অর্থের মালিক কে, অর্থের উৎস কী কিংবা কোনো অর্থ অবৈধভাবে অর্জিত বা পাচার হয়েছে কি না, তা শুধু এই পরিসংখ্যান থেকে নির্ধারণ করা যায় না।
তাই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধিকে কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থপাচারের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন পৃথক আর্থিক অনুসন্ধান ও প্রমাণ।
তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
দুর্নীতির অভিযোগে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে তদন্ত করা এবং অভিযোগের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা দুদকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।
তবে তদন্তের অগ্রগতি বিচার করতে হলে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, নথি সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, তদন্ত প্রতিবেদন এবং মামলার বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আসিফ মাহমুদের ক্ষেত্রে দুদক অনুসন্ধানের ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য চেয়েছে। অন্যদিকে, আরও কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক তদন্তের অবস্থা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি পদক্ষেপ এবং তদন্তের ফল জনসমক্ষে তুলে ধরাই হবে জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
