নিজস্ব প্রতিনিধি, পিরোজপুর : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার অপরাধে মো. জলিল শেখ (৭৭) নামের এক বৃদ্ধের দোকান পুড়িয়ে দিয়ে তাঁকে এলাকাছাড়া করেছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে তাঁর দোকানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরপর থেকে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজ ভিটেমাটিতে ফিরতে পারছেন না চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা এই বৃদ্ধ সাক্ষী।
জলিল শেখ পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামের মৃত মো. মাজেদ শেখের ছেলে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর বিরুদ্ধে আদালতে সাহসিকতার সঙ্গে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই আক্রোশ থেকেই ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর রাতে ইন্দুরকানী উপজেলার পাড়েরহাট বন্দরবাজারে জলিল শেখের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম দফায় হামলা চালায় জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা। সে সময় তাঁকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। পরবর্তীতে সংকটাপন্ন অবস্থায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেছিল।
এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবারও তাঁর ওপর চড়াও হয় চিহ্নিত ওই চক্রটি। স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল মিয়া জানান, চিতলিয়া গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িতরাই জলিল শেখের দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। সর্বস্ব হারিয়ে প্রাণভয়ে সেদিনই পরিবার নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন জলিল শেখ, যাঁর আর বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়নি।
সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর সদর থানায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ছিলেন একই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। সম্প্রতি তাঁর মৃত্যুর পরও জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা যে অমানবিক ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ করেছে, তা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। প্রয়াত সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদীর অনুসারীদের বিরুদ্ধে মানিক পশারীর জানাজা, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা (গার্ড অব অনার) ও দাফনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক কবরস্থানে খোঁড়া কবর মাটি ফেলে ভরাট করে দেওয়ার মতো বর্বরোচিত অভিযোগ উঠেছে। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পুলিশ পাহারায় ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন সম্পন্ন করতে হয়।
মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহের অবমাননা এবং সাক্ষী জলিল শেখের দোকান পুড়িয়ে ভিটেছাড়া করার এসব ধারাবাহিক ঘটনায় পিরোজপুরে যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষীদের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একাত্তরের ঘাতক চক্র ও তাদের দোসররা নতুন করে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে এবং সাক্ষীদের নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
