ফোরটিন ডেস্ক : বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের উৎস সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর অবর্ণনীয় শোষণ, শারীরিক নির্যাতন, রহস্যজনক মৃত্যু ও আইনি সহায়তাহীন মৃত্যুদণ্ডের করুণ চিত্র আবারও সামনে এসেছে। সম্প্রতি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর সেখানের বাংলাদেশ দূতাবাস আগে থেকে না জানার ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিপুল রেমিট্যান্স আয় উদ্যাপিত হলেও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও জীবনের সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে সৌদি আরব থেকে যার পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু এই রেকর্ড আয়ের উল্টো পিঠে রয়েছে প্রবাসী কর্মীদের চরম অসহায়ত্ব। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র নয় মাসে সৌদি আরব থেকে প্রায় দুই হাজার কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে বলে জানিয়েছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।
বিশেষ করে দেশটিতে কর্মরত নারী গৃহকর্মীদের ওপর নেমে আসা পাশবিক নির্যাতনের বিবরণ শিহরিত হওয়ার মতো। অভিবাসী অধিকার বিশেষজ্ঞ এম রায়হান কবিরের দেওয়া তথ্যমতে, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে বহু নারী গর্ভধারণের পর সন্তান কোলে দেশে ফিরে আসছেন। এমনও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা মিলছে যেখানে ভুক্তভোগী নারীরা জানেনই না সেই সন্তানের বাবা আসলে কে সৌদি মালিক, মালিকের ছেলে, তাঁর বন্ধুরা নাকি চালক।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, গত এক দশকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন অন্তত ১০ হাজার নারী কর্মী। গত সাত বছরে বিদেশ থেকে ফিরে আসা প্রায় ৭০ হাজার নারীর মধ্যে অনেকেই নির্মম নিপীড়নের শিকার এবং একই সময়ে নারী কর্মীদের অন্তত ৮০০টি মরদেহ দেশে এসেছে। অথচ শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশ নিরাপত্তার প্রশ্নে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ রাখলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে কোনো কার্যকর প্রতিরোধমূলক অবস্থান নিতে পারেনি।
দেশটিতে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করলেও সেখানে কূটনৈতিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ বহু পুরোনো। প্রবাসীদের রক্ত-ঘামে দেশের চাকা সচল থাকলেও বিপদের সময়ে দূতাবাস পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ বিশিষ্টজনদের। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু রেমিট্যান্সের অংক বাড়ানোই নয়, প্রবাসীদের জীবনের মর্যাদা, আইনি সুরক্ষা এবং মানবাধিকার নিশ্চিতে কূটনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
