জবি প্রতিনিধি: আবাসনসংকট, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং পারিপার্শ্বিক নানা অসুবিধা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও হতাশার অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন।
রবিবার (১১ অক্টোবর) বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের আয়োজনে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
উপাচার্য বলেন, সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার প্রবণতার বিষয়টি উঠে এসেছে। আবাসনসংকট, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং পারিপার্শ্বিক নানা অসুবিধা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও হতাশার অন্যতম কারণ। গত ২১ বছর ধরে এসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেও শিক্ষার্থীদের হতাশা কমাতে কার্যকর ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মধ্যেই মানসিক স্বাস্থ্যচর্চাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং এটি দৈনন্দিন জীবনের প্রতিনিয়ত চর্চার বিষয়। দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে পেশাগত গুরুত্ব ও যথাযথ মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখনই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব অনুধাবন করে এ খাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং এসব দেশে এ বিষয়ে পেশাগত ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও সমৃদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে এ খাতের পেশাগত গুরুত্ব ও কার্যকর সেবাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে শারীরিক সুস্থতাও ব্যাহত হয়। তাই শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে কতটুকু সংস্কার আনা সম্ভব হয়েছে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
জীবনের প্রতিকূলতা মোকাবিলায় ধৈর্য, পারস্পরিক সহযোগিতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্বারোপ করে উপাচার্য বলেন, সৃষ্টিকর্তা আমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য সন্তুষ্ট থাকতে হবে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহের পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা, ধৈর্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে জীবনের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধৈর্য ধারণ এবং ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখাও প্রয়োজন।
মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফাতেমা-তু-জোহরা বিনতে জামানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম এবং মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দীন। সেমিনারে কি-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. আশোক কুমার সাহা। বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মাদ ও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আকরাম উজ্জামান।
সেমিনারে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে তিনটি শিরোনামে ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মশালায় মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক সুস্থতা রক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এর আগে সকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীনের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন, মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেন।
র্যালি শেষে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বরে মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে স্থাপিত মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন (মেন্টাল হেলথ অ্যাসেসমেন্ট) স্টলগুলো পরিদর্শন করেন। এসব স্টলে দিনব্যাপী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও আত্মসম্মানবিষয়ক মূল্যায়ন এবং পরামর্শসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।
উল্লেখ্য, এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য—‘জীবনের অভিজ্ঞতা শুনি: সত্যিকারের কথা, সত্যিকারের পরিবর্তন’। প্রতিপাদ্যটির আলোকে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে শোনা, মানসিক সমস্যার বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
Comments
Previous Articleরাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আয়াসসহ ৪ জন রিমান্ডে
