নিজস্ব প্রতিবেদক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। তবে দীর্ঘ এই সময়েও হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। আদালতে জমা পড়েনি তদন্ত প্রতিবেদনও। ফলে বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে শামীমের পরিবার।
এরই মধ্যে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ও বর্তমানে পলাতক আসামি আহসান লাবিবকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির সভাপতি জাহিদ আহসান পদত্যাগ করার পর লাবিবকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শামীম মোল্লাকে কয়েক দফায় মারধরের পর গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাতে সাভারের গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট, প্রক্টর ভবন এবং পরে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের সময়ও মারধর করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
শামীম মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং জাবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনার জেরেই তাঁকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলা হয় আট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে: শামীমের মৃত্যুর পর ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীন বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় আট শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়। পরে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মামলার এজাহারে নাম থাকা আটজন হলেন—আহসান লাবিব, রাজু আহমেদ, মাহমুদুল হাসান রায়হান, জুবায়ের আহমেদ, হামিদুল্লাহ সালমান, আতিকুজ্জামান, সোহাগ মিয়া ও মোহাম্মদ রাজন মিয়া। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন তখন ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আহসান লাবিব ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জাবি শাখার সমন্বয়ক।
মামলার পাশাপাশি শামীমের বড় ভাই শাহীন আলম ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর ঢাকার আদালতে আরেকটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীন, ডেপুটি রেজিস্ট্রার গাফরুল হাসান চৌধুরী ও তৎকালীন প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলমসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়। পরে আদালত দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্তের নির্দেশ দেন।
দুই বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি: আদালতের নথি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি পিবিআই। অন্যদিকে শামীমের ভাইয়ের করা মামলার নথিও দীর্ঘ সময় পিবিআইয়ের কাছে পৌঁছায়নি।
২০২৬ সালের এপ্রিলেও শামীমের পরিবার অভিযোগ করেছিল, আদালতের নির্দেশের পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও পিবিআই ভুক্তভোগী পক্ষের মামলার নথি পায়নি। ওই সময় তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলার নথি রয়েছে।
বর্তমানে আদালতের নথি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর। তবে তদন্ত কবে শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক আনিসুর রহমান।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, তদন্ত চলছে এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে যেসব আসামি এখনো গ্রেপ্তার হননি, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পলাতক আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁদের গ্রেপ্তারে বাধা সৃষ্টি করছে—এমন অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।
তিনজন জামিনে, পাঁচজন পলাতক: শামীম মোল্লা হত্যা মামলায় ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাহমুদুল হাসান রায়হান এবং ২৯ সেপ্টেম্বর সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। আরেক আসামি আতিকুজ্জামান আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাঁকেও কারাগারে পাঠানো হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, মাহমুদুল হাসান রায়হান, সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া ও আতিকুজ্জামান বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। অন্যদিকে আহসান লাবিব, হামিদুল্লাহ সালমান, রাজন মিয়া, রাজু আহমেদ ও সোহাগ মিয়া পলাতক রয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে পরিবারের অভিযোগ, পলাতক কয়েকজনকে পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা গেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনেও ডেইলি স্টার জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী গত বছরের ২১ মার্চ থেকে লাবিব, সালমান, রাজন ও রাজুকে ক্যাম্পাসে দেখা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাস্তি ছয় মাসেই শেষ: শামীম হত্যার ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে ২০২৫ সালের মার্চে সিন্ডিকেট সভায় বর্তমান শিক্ষার্থীদের ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সনদ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছিল, সাময়িক বহিষ্কারের তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে এই শাস্তির মেয়াদ গণনা করা হবে। ফলে ২০২৫ সালের মার্চেই সেই শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শাস্তির মেয়াদ শেষ হলেও ফৌজদারি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
এজাহারে লাবিবের নামের ক্রম নিয়েও প্রশ্ন: শামীম মোল্লা হত্যার পর মামলার এজাহারে আসামিদের নামের ক্রম পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে করা বহিষ্কারাদেশে আহসান লাবিবের নাম ছিল আট নম্বরে। কিন্তু মামলা করার সময় তাঁকে এক নম্বরে রাখা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। কমিটিকে মামলায় নামের ক্রম পরিবর্তনের অভিযোগ এবং নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে বলা হয়।
মামলার আসামি থেকে ছাত্রশক্তির শীর্ষ পদে: শামীম মোল্লা হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পরও আহসান লাবিব পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও উঠে আসেন।
গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় ছাত্রশক্তির পঞ্চম সাধারণ সভায় সংগঠনটির সভাপতি জাহিদ আহসান ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর লাবিবকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ছাত্রশক্তি এনসিপির ছাত্র সংগঠন।
লাবিবকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা হত্যা মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে মামলায় আসামি হওয়া মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান এবং আদালতে চূড়ান্ত বিচার হয়নি।
লাবিবের বক্তব্য জানতে বিভিন্ন গণমাধ্যম যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাহফুজুর রহমান বলেছেন, লাবিব কতটুকু অপরাধী বা অপরাধী নন, সেটি আইন, আদালত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
বিচারের অপেক্ষায় পরিবার: শামীম মোল্লার বড় ভাই শাহীন আলম অভিযোগ করেছেন, মামলার কয়েকজন আসামির রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে পুলিশ নিষ্ক্রিয় রয়েছে। যদিও তদন্ত কর্মকর্তা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শামীমের মা কোহিনুর বেগমের ভাষ্য, ছেলের হত্যার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি ন্যায়বিচার পাননি। তাঁর একমাত্র দাবি—যারা হত্যার জন্য দায়ী, তাঁদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক।
এদিকে পিবিআই বলছে, তদন্ত চলছে। তদন্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের ভাষ্য, তদন্ত শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় এখনই বলা সম্ভব নয়। ফলে দুই বছর পরও শামীম মোল্লা হত্যা মামলার পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের কার্যক্রমের ওপর।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দুই বছর পরও বিচার শুরু না হওয়া এবং একই মামলার পলাতক আসামির একটি জাতীয় ছাত্র সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া—এই দুই ঘটনাই এখন শামীম মোল্লা হত্যা মামলার অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
