যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইস) তাদের ‘থার্ড কান্ট্রি’ বা তৃতীয় দেশে বিতাড়ন কর্মসূচির আওতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেছে। সিবিএস নিউজের হাতে আসা মার্কিন সরকারের কিছু অভ্যন্তরীণ নথি থেকে জানা গেছে, মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে আফগানিস্তান, কিউবা, নিকারাগুয়াসহ অন্যান্য দেশের ১০০ জনের বেশি অভিবাসীকে আফ্রিকা মহাদেশের আটটি দেশে বিতাড়িত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
আইসের তিনটি ফ্লাইটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত এসব নারী-পুরুষকে বুরুন্ডি, ক্যামেরুন, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, নিরক্ষীয় গিনি, এসওয়াতিনি, লাইবেরিয়া, রুয়ান্ডা এবং সিয়েরা লিওনে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিতাড়িত এই অভিবাসীদের কেউই সেসব দেশের নাগরিক নন।
গত দেড় সপ্তাহে আফগান, কিউবান ও নিকারাগুয়ানদের পাশাপাশি ইরান, নেপাল, তুরস্ক এবং ভেনেজুয়েলার নাগরিকদেরও আফ্রিকার দেশগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন সরকারের এই অভ্যন্তরীণ নথিগুলো প্রকাশ্যে আসার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির একটি ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। নিজ দেশের সাথে কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও চুক্তির মাধ্যমে অভিবাসীদের সম্পূর্ণ অপরিচিত ও দূরবর্তী দেশে নির্বাসিত করার এই অভিযান ক্রমশ জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র।
লাতিন আমেরিকার কোস্টারিকা, পানামা ও প্যারাগুয়েসহ বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ ধরনের অভিবাসীদের গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে। তবে বর্তমানে আফ্রিকার অনেক দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে এই চুক্তিতে জড়াচ্ছে, যার মধ্যে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এবং দক্ষিণ সুদানের মতো সশস্ত্র সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে জর্জরিত দেশগুলোও রয়েছে।
ঘানা ও সিয়েরা লিওনের মতো দেশগুলো কেবল আফ্রিকার অন্যান্য স্থানের অভিবাসীদের গ্রহণ করলেও এসওয়াতিনি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং লাইবেরিয়ার মতো দেশগুলো লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়া থেকে আসা বন্দীদেরও গ্রহণ করছে।
আফ্রিকায় বিতাড়িত এসব অভিবাসীর মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও অনেকেই কেবল অবৈধভাবে প্রবেশ বা বৈধ নথিপত্রের অভাবের কারণে আইসের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সর্বশেষ ফ্লাইটে সিয়েরা লিওন এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে বন্দীদের নামানো হয়।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও রুশ ভাড়াটে যোদ্ধাদের উপস্থিতির কারণে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক দেশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘লেভেল ফোর’ সতর্কতা জারি রয়েছে।
এদিকে, এ বিষয়ে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানিয়েছে, যদি কোনো অবৈধ অভিবাসী নিজ দেশে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আদালতে আবেদন করে, তবে আইন অনুযায়ী তাদের জন্য একটি নিরাপদ দেশের ব্যবস্থা করতে হয়। অন্যদিকে তারা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরতে চাইলে তাদের বিনা মূল্যে ফ্লাইট এবং ৩ হাজার ডলারের চেক দেওয়া হয়।
সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে বিতাড়িত হওয়া এক ২৪ বছর বয়সী আফগান যুবকের ঘটনা এই নীতির ভয়াবহ দিকটি ফুটিয়ে তুলেছে। খলিল নামের ওই যুবকের পরিবার আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর হয়ে কাজ করেছিল এবং সে নিজেও মার্কিন অভিবাসন আদালতে আইনি সুরক্ষা পেয়েছিল।
তা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন তাকে তৃতীয় এই দেশে বিতাড়িত করেছে। মার্কিন মেরিন কর্নেল জাচারি শ্মিডট, যিনি খলিলের ভাইয়ের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন, তিনি খলিলের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শ্মিডট জানান, “খলিলকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হলে তালেবানরা তাকে হত্যা করবে।” খলিলের আইনজীবী আলমা ডেভিডের মতে, “এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার শামিল।”
