কানাডার মন্ট্রিয়লে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মড অ্যাবট মেডিকেল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত একটি চিকিৎসাবিষয়ক নমুনা শিশুদের খাবার খাওয়ার সময় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির এক মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে আছে। নমুনাটি আড়াই বছর বয়সী এক শিশুর শ্বাসনালি। জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, একটি চিনাবাদাম শ্বাসনালির বিভাজনস্থলে আটকে গিয়ে বাতাস চলাচলের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। শিশুটির ফুসফুস স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু বাদাম আটকে যাওয়ার কারণে শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়।
ম্যাকগিলের মড অ্যাবট মেডিকেল মিউজিয়াম বহু বছরের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও রোগতত্ত্বের বিভিন্ন নমুনা সংরক্ষণ করে আসছে। সেখানে থাকা এই নমুনায় শ্বাসনালিটি পেছনের দিক দিয়ে কেটে খোলা হয়েছে, যাতে দেখা যায় কীভাবে চিনাবাদামটি শ্বাসনালির ঠিক সেই জায়গায় আটকে ছিল, যেখান থেকে ডান ও বাম ফুসফুসের দিকে প্রধান শ্বাসনালি ভাগ হয়ে গেছে।
জাদুঘরের বর্ণনা অনুযায়ী, শিশুটির বয়স ছিল আড়াই বছর। চিনাবাদাম শ্বাসনালিতে ঢোকার পর অল্প সময়ের মধ্যেই শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়। ফুসফুসে কোনো রোগ ছিল না। অর্থাৎ মূল সমস্যা ছিল শ্বাসনালিতে খাবার আটকে যাওয়া।
শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পেছনে শারীরিক কারণ রয়েছে। ছোট শিশুদের শ্বাসনালি প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় সরু। একই সঙ্গে তারা খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে গুঁড়ো করার মতো দক্ষতাও পুরোপুরি অর্জন করে না। বিশেষ করে মোলার দাঁত পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগে শক্ত খাবার চিবিয়ে নিরাপদভাবে গিলে ফেলা কঠিন হতে পারে।
খাবার খাওয়ার সময় শিশুর দৌড়ানো, হাঁটা, কথা বলা, হাসা কিংবা তাড়াহুড়ো করে খাওয়াও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব কারণে খাবার ভুল পথে শ্বাসনালিতে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসও ছোট শিশুদের খাবার খাওয়ার সময় বসিয়ে রাখা এবং তাদের নজরদারিতে রাখার পরামর্শ দেয়।
বিশেষ করে চিনাবাদাম ও অন্যান্য বাদাম, বীজ, পপকর্ন, আস্ত আঙুর, শক্ত ক্যান্ডি, কাঁচা শক্ত সবজি এবং বড় বা শক্ত খাবারের টুকরো শিশুদের জন্য দম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের বর্তমান নির্দেশনায় চার বছর বয়স পর্যন্ত বা শিশুর বিকাশ ও পরিপক্বতা অনুযায়ী আরও বেশি সময় এসব উচ্চঝুঁকির খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শুধু খাবার নয়, ছোট খেলনার অংশ, কয়েন, বেলুনসহ বিভিন্ন ছোট বস্তু থেকেও শিশুদের দম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে তিন বছর বা তার কম বয়সী শিশুরা শ্বাসনালির গঠন এবং খাবার চিবিয়ে গেলার দক্ষতা পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
মড অ্যাবট মেডিকেল মিউজিয়ামে থাকা চিনাবাদামের এই নমুনাটি তাই শুধু একটি পুরোনো চিকিৎসাবিষয়ক নিদর্শন নয়। একটি ছোট শিশুর জীবনে সামান্য একটি খাবার কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সেটিও এটি স্পষ্টভাবে দেখায়।
শিশুদের খাবার দেওয়ার সময় বয়স ও চিবানোর সক্ষমতা বিবেচনা করা, ঝুঁকিপূর্ণ খাবার ছোট করে বা নিরাপদভাবে প্রস্তুত করা এবং খাওয়ার সময় শিশুকে নজরদারিতে রাখা দম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাকগিলের সংগ্রহে কয়েক দশক ধরে সংরক্ষিত সেই ছোট্ট শ্বাসনালিটি আজও যেন একই সতর্কবার্তাই দিয়ে যাচ্ছে।
