নিজস্ব প্রতিবেদন : রাজধানীতে অল্প বা ভারী বৃষ্টি হলেই ডুবে যাচ্ছে প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি। প্রধান সড়কের পানি কয়েক ঘণ্টায় সরলেও অলিগলির পানি নামতে সময় লাগছে কয়েক দিন। সম্প্রতি দেশজুড়ে চলমান টানা ভারী বর্ষণে ঢাকা স্রেফ প্রমত্ত নদীতে পরিণত হয়েছে, যাতে নগরবাসীর ভোগান্তি এখন চরমে। সিটি করপোরেশন জলবদ্ধতার জন্য ড্রেনে নাগরিকদের কঠিন বর্জ্য ও প্লাস্টিক ফেলাকে দায়ী করলেও, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন অন্য কথা। তাঁদের মতে, মূল সমস্যা ড্রেনেজের চেয়েও রাজধানীর সামগ্রিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম অকার্যকারিতা। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, মূল যন্ত্রপাতি বিকল থাকা, খালের নাব্যতা সংকট এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার চরম সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতি বছর একই নরকযন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আড়াই কোটি নগরবাসীকে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টির পানি নদীতে নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো ৪১টি স্লুইসগেটের মধ্যে মাত্র ১৯টি বর্তমানে কার্যকর রয়েছে। বাকি ২২টি স্লুইসগেটের মধ্যে ৬টি সম্পূর্ণ অচল এবং ১৫টি আংশিক সচল থাকলেও সেগুলো পানি নিষ্কাশনে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না। উপরন্তু, এসব স্লুইসগেট পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো পর্যাপ্ত জনবলও নেই। একই সঙ্গে রাজধানীর আটটি প্রধান পানি নিষ্কাশন আউটলেটের তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। ড্রেনে জমে থাকা কঠিন বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য দুই সিটি করপোরেশনের মাত্র পাঁচটি সাকার মেশিনের একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। অন্যদিকে দুই সিটির আওতায় থাকা ২৬টি খালের বড় অংশই ইতিমধ্যে পানিপ্রবাহের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৩০৬.৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। অথচ এই বিশাল মেগাসিটির বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকরভাবে নির্ভর করতে হয় মাত্র ৮টি আউটলেটের ওপর। এর মধ্যে মালিবাগ, শান্তিনগর ও মতিঝিল এলাকার পানি টিটিপাড়া পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে; পুরান ঢাকা ও হাজারীবাগের পানি ধোলাইখাল-সূত্রাপুর হয়ে বুড়িগঙ্গায়; গ্রিন রোড ও পান্থপথের পানি হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা পাম্প স্টেশনে এবং বিমানবন্দর এলাকার পানি আব্দুল্লাহপুর আউটলেট দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। এই আউটলেটগুলো আবার রাজউক, দুই সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনসহ ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা দ্বারা বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় সমন্বয়ের বড় অভাব দেখা দেয়। এর মধ্যে কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের ৩টি বড় পাম্পের একটি প্রায় দেড় বছর ধরে বিকল। ফলে প্রতি মিনিটে ৮ লাখ ৫৫ হাজার লিটার পানি অপসারণের সক্ষমতা থাকলেও তা পূর্ণ শক্তিতে কাজ পারছে না।
কর্পোরেশনের প্রকৌশলীদের দাবি, মেগাসিটি ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে এই ৮টি আউটলেট কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। পাঁচ দশক বা ৫০ বছর আগে নগরীতে যে কয়টি আউটলেট ছিল, আজ আড়াই কোটি মানুষের ঢাকাতেও ঠিক সেই কয়টি আউটলেটের মাধ্যমেই পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চলছে। নগরপিতা পরিবর্তন হলেও এই কাঠামোগত উন্নয়নে কেউ নজর দেয়নি। ডিএসসিসির বিদ্যুত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ অবশ্য দাবি করেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে টিটিপাড়ায় নতুন পাম্প সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, “বর্তমান বাস্তবতায় এই মেগাসিটির জন্য মাত্র আটটি আউটলেট কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে যে স্লুইসগেটগুলো আছে, সেগুলো দ্রুত কার্যকরের পাশাপাশি আরও স্লুইসগেট বাড়াতে হবে। এছাড়া আমাদের কেবল সাময়িক বা আপৎকালীন পাম্পিংয়ের ওপর নির্ভর না করে, দীর্ঘমেয়াদি নগর-পরিকল্পনার দিকে যেতে হবে।”
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজিব খাদেম জানান, ড্রেনেজ লাইনে নিয়মিত পলিথিন, প্লাস্টিক ও রাবার ফেলায় ড্রেন দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেক এলাকার পানি দীর্ঘ পথ ঘুরে নদীতে পৌঁছায় বলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নতুন সাকার মেশিন সংযোজনের পরিকল্পনা চলছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ড্রেন ও নালা সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং পানিবদ্ধ এলাকায় দ্রুত পানি অপসারণে মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক যন্ত্রপাতি ও জনবল নিয়োজিত রাখা হয়েছে।
