নিজস্ব প্রতিনিধি : ভাগ্য বদল আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমালেও রেমিট্যান্সের সেই চকচকে চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জঘন্য ও অন্ধকার বাস্তবতা।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত সাত বছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে চরম হেনস্তা, প্রতারণা, শারীরিক-মানসিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত ৮০ হাজার নারী কর্মী শূন্য হাতে দেশে ফিরে এসেছেন।
আরও চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, একই সময়ে ৮০০ জনেরও বেশি নারীর মরদেহ কফিনে চড়ে দেশে ফিরেছে, যা প্রবাসে নারী শ্রমিকদের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের নির্মম চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সাথে গৃহকর্মী আমদানির চুক্তি হওয়ার পর থেকে নারী কর্মী পাঠানোর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, দালের খপ্পরে পড়ে ভালো বেতনের আশায় যাওয়া এই নারীদের একটি বড় অংশই সেখানে গিয়ে আধুনিক যুগের দাসত্বের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং পৌঁছানোর পরপরই নিয়োগকর্তারা বা স্থানীয় এজেন্টরা তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিচ্ছে।
সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় তাদের ওপর চলে একটানা ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করানো, নিয়মিত খাবার না দেওয়া এবং পারিশ্রমিক আটকে রাখার মতো অমানবিক আচরণ।
ফিরে আসা নারীদের জবানবন্দি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে পূর্বে স্বীকার করা হয়েছে যে, ফিরে আসা নারী গৃহকর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, সরল সোজা নারীদের বাসাবাড়িতে কাজের কথা বলে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় অপরাধী চক্রের মাধ্যমে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তির মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়।
নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেকে যখন বাংলাদেশ দূতাবাস বা সেফ হোমে আশ্রয় নিতে পালানোর চেষ্টা করেন, তখন নিয়োগকর্তারা উল্টো তাদের বিরুদ্ধে চুরির মিথ্যা মামলা দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেয় এবং অনেক নারী চরম নির্যাতনের ফলে গর্ভবতী অবস্থায় বা তীব্র মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফিরছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে মৃতদেহের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং গত আট বছরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা প্রায় ৮০০ জন নারী শ্রমিকের লাশের একটি বড় অংশের মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্ট্রোক বা স্বাভাবিক মৃত্যু দেখানো হলেও মানবাধিকার কর্মীরা একে ‘হত্যাকাণ্ড’ বা ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যু’ বলে দাবি করছেন।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ডেটা অনুযায়ী, প্রবাসে নারী শ্রমিকদের আত্মহত্যার প্রায় ৭৬ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে সৌদি আরবে, যেখানে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং দেশে ফেরার কোনো পথ না পেয়ে এই অসহায় নারীরা আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ এবং অভিবাসন খাতের গবেষকরা তীব্র সমালোচনা করে বলছেন যে, রাষ্ট্র সবসময় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাব রাখলেও নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন ভূমিকা পালন করছে।
‘রেমিট্যান্স-ফার্স্ট’ বা অর্থকে প্রাধান্য দেওয়ার এই কূটনীতির কারণে সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর বাংলাদেশ সরকার শক্ত কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না।
ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ বা কঠোর নিয়ম করলেও বাংলাদেশ এখনো সস্তা শ্রম রপ্তানি করে যাচ্ছে এবং আরবের এই আধুনিক দাসপ্রথার শিকার হয়ে কত হাজারো নারীর জীবন চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তার কোনো সঠিক বিচার বা প্রতিকার আজ পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
