শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে দেশে রেকর্ড পরিমাণ দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের এক অবিশ্বাস্য চিত্র উন্মোচন হয়েছে। সময় যত গড়াচ্ছে এই সরকারের বিভিন্ন অপকর্মের ফিরিস্তি ততই দীর্ঘ হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে জমা অর্থের পরিমাণ যেখানে ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ ছিল, সেখানে ২০২৫ সালের শেষে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে।
বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁ ১৫২ টাকা হিসাব করলে ২০২৫ সাল শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট জমার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর গত ২০২৫ সালেই বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
এসএনবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৩.২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ আমানত নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারত এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে ভারতের আমানত আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ হ্রাস পেলেও ইউনূস সরকারের এই আমলে বাংলাদেশের আমানত এক ধাক্কায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক গবেষকদের মতে, সুইস ব্যাংকই বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের একমাত্র বা প্রধান ঠিকানা নয়, বরং মোট পাচার হওয়া অর্থের খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ সেখানে জমা হয়। বাংলাদেশ থেকে মূলত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়।
অতীতের পরিসংখ্যান ও গবেষণা অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে যে পরিমাণ অর্থ বাড়ে, তার অন্তত ১০ গুণ অর্থ উল্লিখিত ১০টি উন্নত দেশ ও ট্যাক্স হ্যাভেনে পাচার করা হয়। সেই গাণিতিক হিসাবে গত এক বছরেই বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বার্ষিক পাচারের ইতিহাসে অতীতের সব রেকর্ডকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছিল বলে অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কমিটি জানিয়েছিল। সেই তথ্য ও সুইস ব্যাংকের বর্তমান রিপোর্টের তুলনা করলে দেখা যায়, ইউনূস আমলে বার্ষিক পাচারের পরিমাণ আওয়ামী আমলের গড় পাচারের চেয়েও অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর অর্থ পাচার রোধ ও পাচারকৃত অর্থ দ্রুত ফেরত আনার যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত স্রেফ ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ছয় মাসের মধ্যে টাকা ফেরত আনার গল্প শুনিয়ে রাষ্ট্রীয় টাকায় বিদেশ সফর করলেও পরবর্তীতে একে অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলে মন্তব্য করেন।
বাস্তবে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া অবৈধ উপায়ে অর্থ পাচার করে দুবাইয়ে তাঁর মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শুধু গভর্নরই নন, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায়ের পরপরই সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ অধিকাংশ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট।
ইউনূস সরকার প্রকৃত অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে এই ইস্যুটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ও স্বনামধন্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে হয়রানি করতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। নিরপেক্ষ তদন্তের আগেই ঢালাও মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করায় দেশের অর্থনীতিতে যেমন বিপর্যয় নেমে আসে, ঠিক তেমনি প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে নতুন করে অর্থ পাচারের পথ পেয়ে যায়।
এমনকি আওয়ামী আমলের অনেক চিহ্নিত অর্থ পাচারকারীর সম্পদ রক্ষার অলিখিত দায়িত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা ইউনূস সরকারের কিছু উপদেষ্টা ও তাঁদের স্বজনরা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা অন্য যেকোনো দলের পরিচয় বা বাছবিচার না করে সব পাচারকারী ও দেশের শত্রুদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে সাধারণ জনগণ।
