কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে পাঁচতারকা হোটেলের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত শত শত কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি প্রকল্পের ব্যাংক হিসাব থেকে ইতিমধ্যে ১৭৫ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার তথ্য মিলেছে, যার বিপরীতে প্রকল্প এলাকায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় সাতটি ব্যাংকের আটটি হিসাবে গত সপ্তাহ পর্যন্ত মোট ১৯০ কোটি টাকা জমা হয়। তবে বর্তমানে এসব হিসাবে মাত্র ১৫ কোটি টাকা জমা রয়েছে। বাকি ১৭৫ কোটি টাকাই বিভিন্ন সময়ে তুলে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি টাকা লেনদেন হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখায়। সেখানে জমা হওয়া ৮২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার মধ্যে প্রায় ৭৬ কোটি টাকাই তুলে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার বিভিন্ন শাখা থেকেও জমার প্রায় সিংহভাগ অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এদিকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ৩০ বিঘা জমির ওপর ১৭ তলা দুটি টাওয়ারসহ বিলাসবহুল কটেজ ও ভিলা নির্মাণের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে শুধু একটি সীমানা প্রাচীর ছাড়া কিছুই নির্মিত হয়নি। স্থানীয়দের মতে, এখন পর্যন্ত সেখানে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার কাজ হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নথিপত্র অনুযায়ী, এই বিতর্কিত প্রকল্পের চেয়ারম্যান পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মাসুদ সাঈদী। ২০ হাজার শেয়ারের এই প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে তার সঙ্গে সমপরিমাণ শেয়ার নিয়ে আরও তিনজন পরিচালক রয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি প্রচলিত আইন অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ্যে শেয়ার বা পার্টনারশিপ বিক্রি করতে পারে না। এর জন্য পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুনির্দিষ্ট অনুমোদন বাধ্যতামূলক, যা এই প্রতিষ্ঠানের নেই।
বিলাসবহুল আবাসন, জমির মালিকানা ও বার্ষিক মুনাফার লোভনীয় ফাঁদে পড়ে ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার গ্রাহক এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন। ন্যূনতম তিন লাখ টাকা করে ধরলেও বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ছাড়ায়। তবে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে শেয়ার বিক্রির সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণে ব্যাপক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রচারপত্রে প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। অনেক গ্রাহক কোনো বৈধ কাগজপত্র বা জমির দলিল না দেখেই কেবল রাজনৈতিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
তবে এই ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ব্যক্তিগত কোনো ব্যবসার দায় সংগঠন নেবে না।
আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি করেন, ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থ অন্য কোথাও এফডিআর করা হয়েছে। অন্যদিকে চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীও অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, দেশে ফিরে তিনি সব নথিপত্র দেখিয়ে সার্বিক ব্যাখ্যা দেবেন।
