নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ক্রমে এক বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং বাকি ৯ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৪৯৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসাব মতে, মৃতদের মধ্যে ৮৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছিল এবং বাকি ৪১৪ শিশু মারা গেছে উপসর্গ নিয়ে।
ভয়াবহ এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়, যেখানে এখন পর্যন্ত ২১০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও এক হাজার ২৬১ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০ জনে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশই শিশু, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সময়মতো ব্যাপক টিকাদান, দ্রুত রোগী শনাক্ত এবং জরুরি অক্সিজেন সেবা নিশ্চিত করা গেলে এত মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এর আগে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে টিকাদান কর্মসূচির সফলতায় সংক্রমণ অনেকটাই কমে আসে এবং গত বছর মাত্র ১৩২ জন রোগী পাওয়া গিয়েছিল।
জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলাতেই এখন সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহেই সংক্রমণ উচ্চ পর্যায়ে থাকছে এবং দৈনিক গড় আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ১০০ ছাড়িয়ে গেছে।
কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। সেখানে ইতিমধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তদের একটি বড় অংশের বয়স ৯ মাসের নিচে, যারা নিয়মিত টিকাদানের আওতায় ছিল না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছে। সঠিক সময়ে অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণ ও পুষ্টিহীনতা দূর করা না গেলে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে এখন হামের টিকার বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। এর আগে যারা দুই ডোজ টিকা পেয়েছে, তাদেরও নতুন ক্যাম্পেইনের আওতায় আবারও টিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব বাড়লেও মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে এখন শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একই সময়ে সুদানে ৩৭১ এবং পাকিস্তানে ৭১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতিমধ্যে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এক কোটি ৮৩ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে অস্থায়ী আইসোলেশন ইউনিট চালুসহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ল্যাব সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইসিইউ বা টিকাদান বাড়ালেই এই সংকট কমবে না, বরং উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও অক্সিজেন থেরাপি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারিভাবে এখনও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নির্দেশিকা বা ক্লিনিক্যাল প্রটোকল প্রকাশ না করায় তৃণমূলের চিকিৎসকেরা সমন্বয়হীনতায় ভুগছেন।
এদিকে ভাইরাসের ধরন পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে নতুন কোনো ভেরিয়েন্টের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্তমান সংকটের মূল কারণ ভাইরাসের রূপবদল নয়, বরং টিকাদানের ঘাটতি ও দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা।
