১৯৬১ সালে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে যে স্বপ্নের বীজ বপন করা হয়েছিল, সেটি ছিল একটি আত্মনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন থমকে যায় বৈষম্যের দেয়ালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পরিকল্পিত অবহেলায়।
১৯৬৩ সালে অনুমোদিত রিয়্যাক্টরটি কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয় করাচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-এ। বাঙালির অর্থে বরাদ্দ, অথচ আলো জ্বলে অন্য ভূখণ্ডে—এ যেন এক নিঃশব্দ লুণ্ঠন। এরপর আসে ১৯৭১। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুভব করেছিলেন, শিল্পায়ন ছাড়া মুক্তি নেই। তাই ১৯৭৩-৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
কিন্তু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে একটি জাতির সম্ভাবনাকেও থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে রূপপুর হয়ে ওঠে ধুলোমাখা কয়েকটি কাগজ —স্বপ্ন থাকে, কিন্তু গতি থাকে না। এই অন্ধকার সময়েই নীরবে লড়াই চালিয়ে যান একজন মানুষ তিনি পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন বিজ্ঞানী— কিন্তু তার লড়াই ছিল ভবিষ্যতের জন্য।
তার পূর্বসূরি ড. উসমানীর স্বপ্নকে তিনি কারিগরি ভিত্তিতে রূপ দেন। পরমাণু শক্তি কমিশনের দায়িত্বে থেকে তিনি রক্ষা করেন সেই জমি, সেই পরিকল্পনা, সেই সম্ভাবনা।
তিনি জানতেন—“জমি হারালে স্বপ্নও হারাবে।”
বছরের পর বছর তিনি গবেষণা করেছেন, নথি তৈরি করেছেন, একটি রোডম্যাপ তৈরি করে গেছেন। ১৯৯৬ সালে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু হলেও পরবর্তীতে এগিয়ে যায়নি।এরপর ২০০৯ সালে নতুন করে পুনরায় কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর, ২০১৩ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ।
নভেম্বর, ২০১৭ সালে নির্মান কাজ শুরু হয়। এটার লোডিং আজ নয় আরও আগে শুরু হবার কথা ছিল।গত সাড়ে তিন বছরে কাজটি পিছিয়ে দেয়া হয়।আরও আগে যদি শুরু হতো তাহলে রূপপুরের একটি ইউনিট চালু হলে বছরে ১০০ কোটি ডলারের জ্বালানী আমদানি সাশ্রয় করা যেত। আজকের এই দিনে তৎকালীন তবে এর পরিকল্পনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭৫ এর পর কাজ আর এগোইনি।পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আবার এটা নিয়ে কাজ শুরু হয়। স্বপ্নের শুরু হয় ২০১৩ সালে। যার বাস্তবায়ন হলো ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ সাল। সংক্ষেপে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে চলুন জানি-“পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম ও সর্ববৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নিয়ে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। রাশিয়ার রোসাটম-এর সহায়তায় নির্মিত এই প্রকল্পে আধুনিক প্রজন্মের ৩+ প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। এটি দেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ১০-১২ শতাংশ পূরণ করবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান তথ্যসমূহ:
অবস্থান: রূপপুর, পাকশী, ঈশ্বরদী, পাবনা।
ক্ষমতা: ২,৪০০ মেগাওয়াট (১২০০ মেগাওয়াট × ২ ইউনিট)।
প্রযুক্তি: রাশিয়ান ৩+ প্রজন্মের ভিভিইআর (VVER) প্রযুক্তি।
জ্বালানি: ইউরেনিয়াম (রাশিয়া থেকে সরবরাহকৃত)।
মূল ঠিকাদার: রোসাটম (রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন)।
নিরাপত্তা: সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি (IAEA) নির্দেশিকা অনুসরণ।
সুবিধা: জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে (৬০-১০০ বছর) নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন।
এই প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) স্থাপন শুরু হয়েছে এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্যমতে, এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপের কাছাকাছি রয়েছে। এটি চালু হলে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হবে। এটি একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, অবিচার পেরিয়ে উঠে দাঁড়ানোর গল্প। এটি ধৈর্য, মেধা ও দেশপ্রেমের এক জীবন্ত প্রতীক। যখন এই কেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিট চালু হবে, আর বাংলার ঘরে ঘরে আলো জ্বলবে—সেই আলোর ভেতর লুকিয়ে থাকবে এক বিজ্ঞানীর নিরলস পরিশ্রম। যিনি ড. এম ওয়াজেদ মিয়া। যার কাছে জাতি কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে চিরকাল।
