আরিফ জেবতিক
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে প্রথম আলোর আনিসুল হকের একটি ফেসবুক পোস্টের জবাব দিয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
নওফেল সাহেবের কথার যুক্তি আছে, কিন্তু যুক্তির সাথে কিছু ‘কিন্তু’ও বিবেচনা করা উচিত, যা হয়তো করা হয়নি।
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রকৃত ইমপ্যাক্ট বিষয়ে নওফেল সাহেব বলেছেন, ‘ঢাকা-ভিত্তিক কিছু কার্যক্রম দেখে রাজধানীর এলিটদের মনে প্রশান্তি আসে। বাস্তবতা ভিন্ন। যেমনটা ছিল আপনাদের প্রিয় প্রতারক ইউনুসের মিষ্টি কথার ফুলঝুরিতে।’
আমাদের প্রস্তাব ছিল—বছরে প্রায় ৪০-৫০ কোটি টাকা (কমবেশি প্রতি বছর), যা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র নেয়, যদি জেলা পর্যায়ের পাঠাগারগুলোর মধ্যে এই অর্থ বণ্টন করা হয়, তাহলে সারা দেশে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার বাস্তব পরিবর্তন দেখা যেত। জেলার পাঠাগারগুলো বিদ্যালয়গুলোতে পৌঁছাতে অনেক সহজেই পারে। রিচ বেশি, খরচ কম, ইমপ্যাক্ট অনেক বেশি।’
এটি প্রস্তাব হিসেবে যুক্তিযুক্ত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই কাজগুলো দায়সারা গোছের করে। বরং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো করে। এজন্যই সকল দেশেই এ ধরনের এনজিওগুলোকে সরকার টাকাপয়সা দেয়। এবং ইমপ্যাক্ট বিবেচনা করলে এগুলোর সরাসরি ইমপ্যাক্ট ব্যয়ের তুলনায় হয়তো কম। কিন্তু নওফেল সাহেব যে বলেছেন, ‘এলিটদের মনে প্রশান্তি আসে’—এটি সত্যি, এবং এই ইমপ্যাক্টটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
আমাদের স্কুল-কলেজগুলোতে পাঠাগার নেই, পাঠাগার থাকলেও লাইব্রেরিয়ান নেই। আমরা যখন সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলে পড়তাম, আমাদের ৩০ হাজার বইয়ের একটি বিশাল লাইব্রেরি ছিল, কিন্তু সেটি বছরের পর বছর তালাবদ্ধ থাকত। কারণ, লাইব্রেরিয়ান নেই। ক্লাস থ্রি থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত সেই লাইব্রেরির কাচের জানালা দিয়ে আমরা লোভাতুর চোখে তাকিয়ে থেকেছি, কিন্তু কখনোই বইগুলো হাতে ধরে দেখতে পারিনি। আমাদের আগের প্রজন্মও এভাবে কাচের জানালার বাইরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁদের ছাত্রজীবন শেষ করেছে—বইগুলো পড়তে পারেনি। (পরবর্তীতে শুনেছি, এখন স্কুল পাঠাগারটি চালু হয়েছে; কেউ নিশ্চিত জানলে কমেন্টে জানান।)
সুতরাং এই স্কুলগুলোতে পাঠাগার স্থাপন এবং সেগুলোকে যথাযথভাবে পরিচালনা করা সরকারের একটি দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের সাথে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে প্রতিদিনের খরচ হিসেবে সরকারের তরফ থেকে ১২ লাখ টাকা দেওয়ার কোনো যোগসূত্র নেই। সরকারি দায় সরকার মেটাবে। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই কোটি কোটি টাকাও দিয়ে যেতে হবে। সরকারের কাছে হয়তো বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ইমপ্যাক্ট অপ্রতুল মনে হতে পারে, কিন্তু ‘বই একটি পবিত্র বস্তু, ইহা পাঠ করিতে হইবে’—এই কনসেপ্টটি সমাজে চালু ও প্রচারের জন্য বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখাও প্রয়োজন।
রাজনীতিতে ‘এলিটদের মনে প্রশান্তি আসে’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এই ফ্যাক্টরটিকে অবহেলা করলে কী হয়, সেটি আওয়ামী লীগ টের পেয়েছে। এখন সারাদেশের মানুষ বলে, ‘ইউনূস কী জিনিস, সেটি শুধু শেখ হাসিনাই টের পেয়েছিলেন।’ বিষয়টি সত্যি। ইউনূস কী জিনিস, সেটি শেখ হাসিনাই আগে টের পেয়েছিলেন, কিন্তু সেটাকে তিনি ঠিকমতো ব্যবহার করেননি। এখন দেখেন, দেশের কী ঠাডা পড়ে আছে। এই দেড় বছরের মব সন্ত্রাসের ট্রমা, দেশের সাংস্কৃতিক টেক্সচার ছিন্নভিন্ন হওয়ার দীর্ঘস্থায়ী ইমপ্যাক্ট, আমেরিকান গোলামি চুক্তি, হামে দেশের শত শত শিশুর মৃত্যু—এসব দিয়ে এর মূল্য চুকাতে হচ্ছে।
অথচ সঠিক কৌশল হওয়ার দরকার ছিল পুরো উল্টো। যেহেতু ‘ইউনূস কী জিনিস’ সেটি শেখ হাসিনা টের পেয়েছিলেন, তাঁর দরকার ছিল ইউনূসকে মন্ত্রী মর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। সরকারি টাকায় ইউনূস সাহেব দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াতেন এবং ‘আমাদের দেশ থেকে লোক নেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে চিঠি দিচ্ছে, অ্যাপ্লিকেশন দিচ্ছে’—এসব ভূয়া কথাবার্তা বলে বাংলার মিডল ক্লাসকে প্রশান্ত রাখতে পারতেন। কেউ বাটপার—এটি টের পেলেই তার বিরুদ্ধে লেগে যেতে হয় না; বরং সেই বাটপারের এক্সপার্টিজকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে হয়—এটাই রাজনীতির জন্য ভালো। ইউনূস স্যারের পেছনে সরকার যদি বছরে এভাবে ৪০/৫০ কোটি টাকা খরচ করত, তাহলে সেটা সরকারের স্টেবিলিটির জন্য ভালো হতো।
সুতরাং তারেক রহমানের প্রতি অনুরোধ থাকবে, আপনি দয়া করে এসব ‘এলিটদের মনে প্রশান্তি আসে’ টাইপের সকল কর্মসূচিকে উৎসাহিত করে যান। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ইমপ্যাক্টকে আপনি ‘কতজন ছাত্র বই পড়তে পারল’—এই স্কেলে মাপতে গেলে লাভ দেখতে পাবেন না।
কিন্তু এই যে দেখেন, আপনি শুধু সায়ীদ স্যারের সাথে দেখা করেছেন—এতেই আনিসুল হক সাহেবরা কত খুশি হয়ে গেছেন। একেবারে মিথ্যা-মিথ্যি নওফেল সাহেবের বিরুদ্ধে একটি কামান দাগিয়ে বসেছেন।
এই অদেখা ইমপ্যাক্টই গুরুত্বপূর্ণ। বই পড়ার সাথে এর দূরবর্তীও কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু এর রাজনৈতিক ইমপ্যাক্ট প্রচুর।
সুতরাং এলিটদেরকে খুশি রাখুন। যে যত বেশি এলিটদেরকে খুশি রাখতে পারবে, সে তত বেশি আরামে ক্ষমতায় থাকতে পারবে।
