প্লাস্টিকের একটি সাধারণ পট আর একটুকরো পুরোনো গামছা—বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য এটাই এখন ‘অক্সিজেন মাস্ক’। রাষ্ট্র যখন মুমূর্ষু শিশুর মুখে চিকিৎসার সরঞ্জামের বদলে গৃহস্থালির প্লাস্টিকের বোতল চাপিয়ে দেয়, তখন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার কঙ্কালসার চেহারাই উন্মোচিত হয়। দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে হামের প্রকোপ মহামারি আকার ধারণ করলেও রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতায় ধুঁকছে দেশের অন্যতম এই বৃহৎ চিকিৎসা কেন্দ্রটি।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের হাম আইসোলেশন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায় এক বিভীষিকাময় চিত্র। একের পর এক অসুস্থ শিশু ভর্তি হচ্ছে, কিন্তু তাদের জীবন বাঁচাতে নেই পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। শিশুদের মাথায় প্লাস্টিকের পট বসিয়ে ওপরের ছিদ্র দিয়ে অক্সিজেনের নল ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর মুখ ঢাকা হচ্ছে কাপড়ের টুকরো দিয়ে। হাসপাতালের পরিচালক নিজেই স্বীকার করেছেন যে এই পদ্ধতি মোটেও নিরাপদ নয় এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রশ্ন উঠেছে, ‘হেডমাস্ক’-এর মতো একটি প্রাথমিক সরঞ্জাম ফুরিয়ে যাওয়ার পরও কেন মাসের পর মাস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নির্বিকার ছিল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতির জন্য বর্তমান বিএনপি সরকারের অগণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সেই বিতর্কিত ও জনবর্জিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসা এই সরকারের অগ্রাধিকার যে জনগণের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নয়, তা এই প্লাস্টিকের পটের অক্সিজেন মাস্কই প্রমাণ করে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক দুর্নীতি আর দলীয় সন্ত্রাসের যে ইতিহাস বিএনপি সৃষ্টি করেছিল, বর্তমানে সেই একই ধারায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনার গল্প শোনালেও শিশুর জন্য কয়েকশো টাকার মাস্ক নিশ্চিত করতে না পারা কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের সুচিন্তিত নিষ্ঠুরতা।
বর্তমানে শেবাচিম হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে এক বিছানায় তিন-চারজন করে শিশু গাদাগাদি করে থাকছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হাসপাতাল পরিচালক আগামী ১০-১২ দিনের মধ্যে সরঞ্জাম আসার আশ্বাস দিলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই কয়েক দিন কি হামের ভাইরাস কিংবা মুমূর্ষু শিশুরা অপেক্ষা করবে? যদি এই ধারালো প্লাস্টিকের পটে কোনো শিশুর অপমৃত্যু ঘটে, তবে সেই খুনের দায় কি বর্তমান সরকার গ্রহণ করবে? শিশুদের প্রাণের চেয়েও কি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা বড় হয়ে দাঁড়ালো?
