দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের ঘটনা কমেনি; বরং কিছু ক্ষেত্রে তা বেড়েছে বলে দাবি করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তত ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুইটি টিম লিডার মরিয়ম নেসা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ১ হাজার ২৮১টি। আগের মাস ডিসেম্বরেও এ ধরনের মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৪৮টি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তত ৩২ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৮৩ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩২ জন ধর্ষণের শিকার এবং ৪ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৫ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। একই সময়ে ১০ জন গণধর্ষণের শিকার হন এবং তিনজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীতে এক কিশোরীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। আবার ২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে বাড়িতে ঢুকে এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং তার দাদিকে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বর্তমান সরকারের সময় দেশে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে।
তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা কেবল সাম্প্রতিক সময়ের ফল নয়; দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইন না মানা এবং আইনের শাসনের ঘাটতির কারণে অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে।
তিনি বলেন, নতুন সরকার এখনো দায়িত্ব নেওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই দ্রুত অপরাধীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তা না হলে সহিংসতার এই প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক রূপ নিতে পারে।
