নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি একতরফাভাবে ঝুঁকে না পড়ে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ধরে ‘ভারতবিরোধী’ রাজনীতির তকমা বহন করা দলটি তার নেতৃত্বে ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথে এগোবে কি না—সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ঘিরে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থতার কারণে রাজনীতি থেকে কার্যত দূরে থাকলেও দলের নেতৃত্বে এখন তারেক রহমানই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন। প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি অংশ তাকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছে। তবে দেড় দশকের বেশি সময় লন্ডনে অবস্থান এবং দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় ভারতের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তারেক রহমানের অবস্থান জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
শুক্রবার দলীয় কার্যালয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয়—নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি কি ভারত থেকে সরে গিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকবেন?
প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ এমন অংশীদার চায়, যারা দেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সক্ষম।
এর আগেই একই দিন বিকেলে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দলের রাজনৈতিক ও নীতিগত রূপরেখা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “আমরা যদি সরকারে থাকি, আমাদের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য আনতে হবে, যাতে নতুন চাকরি সৃষ্টি হয় এবং মানুষ ভালো জীবনযাপন করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “পাশাপাশি অবশ্যই বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে যে–ই আমাদের জনগণ ও দেশের জন্য উপযুক্ত প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই আমরা বন্ধুত্ব রাখব—কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে নয়।”
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে তারেক রহমানের ‘প্যারালাল সরকার’ পরিচালনা এবং ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়ে সে সময় দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। ভারতীয় গণমাধ্যমে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের যোগাযোগের অভিযোগও প্রকাশিত হয়, যা দিল্লিকে উদ্বিগ্ন করেছিল বলে দাবি করা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমে এলেও, ভারতের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে বিএনপির সাবেক জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় ১৬ মাস পর, গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন তারেক রহমান।
এদিকে ঢাকার একটি আদালত গত বছর বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাকে আশ্রয় দেওয়ার ভারতের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। শেখ হাসিনাসহ দলটির অধিকাংশ শীর্ষ নেতা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন বা বিদেশে অবস্থান করছেন।
শেখ হাসিনার সন্তানদের ভবিষ্যতে রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান বলেন, “মানুষ যদি কাউকে গ্রহণ করে এবং স্বাগত জানায়, তাহলে যে কারও রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে।”
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের প্রস্তাব নাকচ করে তিনি বলেন, “আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরকার গঠন করলে বিরোধী দল কে হবে? আমি জানি না তারা কতটি আসন পাবে। তবে তারা যদি বিরোধী দলে থাকে, আমি আশা করি তারা একটি ভালো বিরোধী দল হবে।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। একসময় নিষিদ্ধ থাকলেও দলটি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থান ঘটিয়েছে। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার গঠন করলেও এবার জামায়াত জাতীয় ঐক্য সরকারের প্রস্তাব দিয়েছে।
বিএনপির সহযোগীরা জানিয়েছেন, দলটি ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেতে আশাবাদী। বিএনপি এককভাবে ২৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে, বাকি আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তাদের জোটসঙ্গীরা।
নির্দিষ্ট আসনসংখ্যা নিয়ে মন্তব্য না করলেও তারেক রহমান বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারব।”
জনমত জরিপগুলোতে বিএনপির জয় সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিললেও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দলটি—এমন আভাসও উঠে এসেছে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা হাসিনাবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা জেন–জিদের দল এনসিপিও জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ঐক্যে যুক্ত হয়েছে।
‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের অঙ্গীকারে ৯টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তারেক রহমান বলেন, “আমার দেশের স্বার্থ ও আমার দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা করা সম্ভব, তাদের সঙ্গেই আমরা সম্পর্ক রাখব।”
তিনি আরও বলেন, “পাশাপাশি অবশ্যই আমার দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে হবে—এই ভিত্তিতেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে।”
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বড় মানবিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। তাদের কর্মসংস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত। তারা মানুষ—মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা তাদের দেখভাল করছি। তবে আমরা চাই, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হলে তারা ধীরে ধীরে নিজ দেশে ফিরে যাক।”
পানি বণ্টন ও প্রতিবেশী সম্পর্ক
বাংলাদেশ–ভারতের পানি বণ্টন ইস্যুতে তিনি বলেন, “পদ্মা, তিস্তা নদীসহ বিভিন্ন নদীর পানির বণ্টনে আমাদের সমস্যা আছে। আমরা আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান চাই, যাতে দেশের মানুষ ন্যায্য হিস্যা পায়।”
প্রবাসী ও কূটনৈতিক মিশন
প্রবাসীদের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশে থাকা প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশির সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় করা হবে।
তিনি বলেন, “দূতাবাসগুলোকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করে প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।”
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী।
