বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশে যাওয়ার পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ভ্রমণ সব ক্ষেত্রেই ভিসা জটিলতা এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘোষণা দিয়ে কিংবা নীরবে, অনেক দেশই বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার হার কমিয়ে দিয়েছে। এতে বিপাকে পড়ছেন শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও ভ্রমণপ্রেমী মানুষ।
কূটনৈতিক সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ অভিবাসন, ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার, দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভিসা নীতিতে এবং শ্রমবাজারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভিসা নীতির সঙ্গে অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গভীরভাবে জড়িত। কোনো দেশে বিনিয়োগ কমে গেলে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে তারা ভিসা শিথিল করতে আগ্রহ দেখায় না। বাংলাদেশে এখনো নির্বাচিত সরকার না থাকা, সহিংসতার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিদেশি দেশগুলো বাংলাদেশিদের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ ২৬টি দেশের নাগরিকদের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভ্রমণ ভিসা দিত, সেখানে বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে দুই লাখের নিচে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, ভিয়েতনাম, উজবেকিস্তানসহ অনেক দেশ কার্যত বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া বন্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত করেছে। ইউরোপ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও আগের তুলনায় অনেক কম ভিসা দিচ্ছে।
পর্যটন খাতও এর বড় ভুক্তভোগী। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) তথ্যমতে, বিদেশ ভ্রমণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ভারতের পর্যটন ভিসা বন্ধ থাকায় এবং অন্যান্য দেশের ভিসা প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় ভ্রমণ ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শ্রমবাজারের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশি শ্রমিক প্রেরণ সীমিত বা বন্ধ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েতের বাজার প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। জাপানে শ্রম রপ্তানির পরিকল্পনা থাকলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাস্তবায়ন খুবই কম।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ভিসা জটিলতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে। ভুয়া কাগজপত্রের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীদের আবেদনও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দিকে নজর না দিলে বিদেশের দরজা আরও সংকুচিত হবে। ভিসা সংকট শুধু ভ্রমণ নয়, রেমিট্যান্স ও অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
