ফোরটিন ডেস্ক : সমুদ্রের তলদেশে থাকা যোগাযোগ ক্যাবল ও জ্বালানি পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ। বাল্টিক সাগরে একাধিক যোগাযোগ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এবং আর্কটিক অঞ্চলে রুশ সাবমেরিনের সন্দেহজনক তৎপরতা ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নাশকতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে গোপন তৎপরতা আধুনিক বিশ্বের যোগাযোগ, অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এলিজাবেথ ব্রের নতুন বই ‘আন্ডারসি ওয়ার: দ্য ব্যাটল টু কন্ট্রোল দ্য ক্যাবলস অ্যান্ড পাইপলাইনস দ্যাট কানেক্ট আওয়ার ওয়ার্ল্ড’-এ সমুদ্রতলের এই অবকাঠামোর কৌশলগত গুরুত্ব এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। বইটি ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয়েছে।
বাল্টিক সাগরে দুই যোগাযোগ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত
ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০২৪ সালের ১৭ ও ১৮ নভেম্বর বাল্টিক সাগরে দুটি ফাইবার অপটিক যোগাযোগ ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা। একটি ক্যাবল সুইডেনের গটল্যান্ড দ্বীপের সঙ্গে লিথুয়ানিয়াকে যুক্ত করেছিল। অন্যটি ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি থেকে জার্মানির রোস্টক বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল।
ক্যাবল দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সময় চীনা কার্গো জাহাজ ‘ই পেং ৩’ ওই অঞ্চলে চলাচল করছিল। জাহাজটির গতিপথ ও ঘটনার সময়ের সঙ্গে এর অবস্থানের মিল পাওয়ায় তদন্তকারীদের সন্দেহের কেন্দ্রে আসে এটি। ডেনমার্কের নৌবাহিনীও জাহাজটির কাছাকাছি অবস্থান নেয়। তবে জাহাজটির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও শুধু এ তথ্যের ভিত্তিতে চীন সরকারের নির্দেশে নাশকতা চালানো হয়েছিল বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
এ ধরনের ঘটনা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ বা প্রচলিত যুদ্ধের বাইরে পরিচালিত চাপ প্রয়োগ ও নাশকতামূলক তৎপরতার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এ ধরনের তৎপরতায় সামরিক শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলা হতে পারে।
আর্কটিক অঞ্চলে রুশ সাবমেরিনের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ
সমুদ্রতলের ক্যাবল নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের পর। সেখানে পশ্চিমা দুই কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, নরওয়ের স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার সমুদ্রতল-সংক্রান্ত সামরিক ইউনিট জিইউজিআইয়ের সাবমেরিন ও গভীর সমুদ্রের যান ব্যবহার করে একটি গোপন মহড়া চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটেন, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বাহিনী রুশ যানগুলোকে অনুসরণ করে এবং তাদের কার্যক্রমে বাধা দেয়। ওই তৎপরতায় সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের পরীক্ষা ভবিষ্যতে সমুদ্রতলের অবকাঠামোতে নাশকতা চালানোর সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ হতে পারে।
বিশ্ব ইন্টারনেটের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি সমুদ্রতলের ক্যাবল
আধুনিক বিশ্বের ডিজিটাল যোগাযোগের বড় অংশ নির্ভর করে সমুদ্রতলের ফাইবার অপটিক ক্যাবলের ওপর। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, ইমেইল, ভিডিও কল এবং বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল সেবার তথ্য এসব ক্যাবলের মাধ্যমে আদান-প্রদান হয়। সমুদ্রের নিচে থাকা পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ ক্যাবলও বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এলিজাবেথ ব্রের বইয়ে সমুদ্রতলের এই নেটওয়ার্কের ব্যাপকতা এবং আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গে এর নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এ অবকাঠামোর কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা আর্থিক ও অন্যান্য ডিজিটাল সেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে একটি বা একাধিক ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হলেই পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। বিকল্প ক্যাবল ও বিকল্প রুটের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে তথ্যপ্রবাহ সচল রাখা সম্ভব। ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাবলের অবস্থান, নেটওয়ার্কের বিকল্প ব্যবস্থা এবং মেরামতের সময়ের ওপর।
তাইওয়ান ও বাল্টিক সাগরের ঘটনা বাড়িয়েছে সতর্কতা
সমুদ্রতলের যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে তাইওয়ানের আশপাশের ক্যাবল নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৩ সালে তাইওয়ানের মাতসু দ্বীপের সঙ্গে সংযোগকারী দুটি ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দ্বীপটির যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এ ঘটনায় চীনা জাহাজের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হলেও প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণে তদন্তের তথ্য আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি।
বাল্টিক সাগরেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যোগাযোগ ক্যাবল ও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার মধ্যে থাকা বাল্টিককানেক্টর গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও এর মধ্যে রয়েছে। ২০২২ সালে নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনে বিস্ফোরণের ঘটনাও ইউরোপের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছিল। তবে এসব ঘটনার পেছনে কারা দায়ী, তা প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হয়।
আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজন
সমুদ্রতলের ক্যাবল সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো থাকলেও আন্তর্জাতিক জলসীমায় সন্দেহভাজন জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জটিল হতে পারে। কোন দেশের জলসীমায় ঘটনা ঘটেছে, জাহাজটি কোথায় নিবন্ধিত, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং তদন্তে পাওয়া প্রমাণের ওপর আইনি পদক্ষেপ নির্ভর করে। ফলে আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমুদ্রতলের অবকাঠামোর নিরাপত্তা বাড়ানোর একটি উপায় হলো বিকল্প বা অতিরিক্ত ক্যাবল স্থাপন। একটি সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য রুট দিয়ে তথ্যপ্রবাহ চালু রাখা গেলে বড় ধরনের বিঘ্নের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি নজরদারি, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত করা, মেরামতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি।
সমুদ্রতলের ক্যাবল ও পাইপলাইন এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত বা বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব নেটওয়ার্কে নাশকতার আশঙ্কা বাড়ায় এগুলোর সুরক্ষা, বিকল্প ব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা বিশ্ব অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফোকাস কিওয়ার্ড:
সমুদ্রতলের ক্যাবল, রাশিয়া চীন, বিশ্ব ইন্টারনেট, আন্ডারসি ওয়ার, এলিজাবেথ ব্র, ই পেং ৩, বাল্টিক সাগর ক্যাবল, রুশ সাবমেরিন, জিইউজিআই, ন্যাটো, হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার, সমুদ্রতলের পাইপলাইন, ইন্টারনেট নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
