ফোরটিন ডেস্ক : ২০৫০ সালের মধ্যে রোবটের সাহায্যে পুরো একটি সম্প্রদায় বা শহরের অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হতে পারে। ভবিষ্যতের নগরজীবনে চালকবিহীন গাড়ি, পরিবেশবান্ধব বহুতল ভবন এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম বাড়ির ব্যবহার বাড়তে পারে। বিশ্ব স্থাপত্য দিবস উপলক্ষে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজউইককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন স্থপতি।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রায় ৩৪০ কোটি মানুষের নিরাপদ ও পর্যাপ্ত আবাসনের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শহরে বসবাস করবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির সীমাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ভবিষ্যতের আবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থপতিরা।
একক বাড়ির বদলে বহুতল ও মিশ্র ব্যবহারের আবাসন
স্থপতিদের মতে, ভবিষ্যতে একক পরিবারের জন্য আলাদা জমিতে বাড়ি নির্মাণের প্রচলিত ধারণা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে পারে। ক্রমবর্ধমান নগর জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে বহুতল ভবন এবং একই এলাকায় আবাসন, কর্মক্ষেত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা সমন্বিতভাবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব বাড়বে।
স্থপতি জেমস সাইসাকর্নের মতে, জনসংখ্যার চাপ সামলাতে ব্যক্তিগত জমিতে একক পরিবারের বাড়ি নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নয়। অন্যদিকে, স্থপতি মাইলস স্মিথ মনে করেন, জমির সীমাবদ্ধতা, নির্মাণ ব্যয় এবং দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতির কারণে একক বাড়ি নির্মাণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে ‘মিসিং মিডল’ নামে পরিচিত মাঝারি ঘনত্বের আবাসনব্যবস্থা আবার জনপ্রিয় হতে পারে বলে মনে করেন স্থপতি ক্লারা ওয়াইনবার্গ। এ ধরনের পরিকল্পনায় টাউনহাউস ও ছোট আকারের একাধিক আবাসন তৈরি করা হয়, যা দেখতে প্রচলিত বাড়ির মতো হলেও তুলনামূলক কম জায়গায় বেশি মানুষের বসবাসের সুযোগ দেয়।
ব্যক্তিগত বাড়ির বড় উঠানের পরিবর্তে উন্মুক্ত জায়গায় পার্ক, সবুজ এলাকা এবং সামাজিক মিলনস্থল তৈরি করা সম্ভব হবে। স্থপতি বেন ওয়ানের মতে, উপযুক্ত নীতিমালার মাধ্যমে মাঝারি আকারের বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ বাড়ানো গেলে আরও প্রাণবন্ত ও সংযুক্ত কমিউনিটি গড়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু সহনশীল ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাড়ি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ভবিষ্যতের বাড়িগুলোকে আরও টেকসই করে নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থপতিরা। স্থপতি ড্যানিয়েল বাউম্যানের মতে, ২০৫০ সালের আবাসনব্যবস্থাকে তীব্র গরম, ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার উপযোগী হতে হবে। একই সঙ্গে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে আনার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
স্থপতি স্কট স্পেক্ট মনে করেন, ভবিষ্যতের বাড়িগুলো নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে। ফলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধা পাওয়া যাবে।
এ ধরনের বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে কৃত্রিম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনও কমানো সম্ভব হবে।
কংক্রিটের বিকল্প হিসেবে কাঠের ব্যবহার
পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে কাঠের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন স্থপতিরা। বিশেষ করে ক্রস-ল্যামিনেটেড টিম্বার বা সিএলটি নামে পরিচিত প্রকৌশলগতভাবে তৈরি কাঠের প্যানেল ভবিষ্যতের নির্মাণশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থপতি জেমস সাইসাকর্নের মতে, এ ধরনের কাঠের প্যানেল মজবুত, দ্রুত স্থাপনযোগ্য এবং বহুতল ভবন নির্মাণে ব্যবহারযোগ্য। নির্মাণসামগ্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবেশের ওপর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হবে।
তবে কাঠের ব্যবহার বাড়লেই পরিবেশগত প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে, এমন নয়। কাঠের উৎস, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, অগ্নিনিরাপত্তা এবং ভবনের স্থায়িত্বের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
চালকবিহীন গাড়িতে বদলাবে শহরের নকশা
ভবিষ্যতের শহর গাড়িকেন্দ্রিক না হয়ে মানুষকেন্দ্রিক হবে বলে মনে করেন স্থপতি ক্লারা ওয়াইনবার্গ। তাঁর মতে, চালকবিহীন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন আনলে বাড়ির নকশায় বড় গ্যারেজ ও পার্কিংয়ের জন্য আগের মতো জায়গা রাখার প্রয়োজন কমে যেতে পারে।
সেই জায়গাগুলো পার্ক, হাঁটার পথ, উন্মুক্ত স্থান এবং সামাজিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গণপরিবহনকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে বাস, ট্রেন ও অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সংযোগ বাড়ানো গেলে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
এর ফলে হাঁটার উপযোগী, তুলনামূলক কম যানজটপূর্ণ এবং মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের কাছাকাছি সেবাসমৃদ্ধ শহর গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
একই আবাসনে যৌথ সুযোগ-সুবিধা
ভবিষ্যতের আবাসনব্যবস্থায় শুধু ঘরের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। স্থপতি ম্যাক্স বার্গার ও ড্যানিয়েল বাউম্যানের মতে, বিচ্ছিন্ন আবাসন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত পাড়াভিত্তিক পরিকল্পনা গুরুত্ব পাবে।
এ ধরনের আবাসনে ছাদের বাগান, শরীরচর্চার জায়গা এবং কাজের জন্য নির্ধারিত স্থানসহ বিভিন্ন যৌথ সুযোগ-সুবিধা থাকতে পারে। স্থপতি মাইলস স্মিথ এ ব্যবস্থাকে আধুনিক ‘কান্ট্রি ক্লাব’ ধরনের জীবনযাপনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে একই ভবন বা আবাসন এলাকার বাসিন্দারা বিভিন্ন সুবিধা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবেন।
রোবটনির্ভর নির্মাণে নতুন সম্ভাবনা
ভবিষ্যতের শহর নির্মাণে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। নির্মাণকাজে রোবট ব্যবহার করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়ানো, নির্ভুলতা উন্নত করা এবং শ্রমিকের ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।
তবে ২০৫০ সালের মধ্যে রোবট দিয়ে সম্পূর্ণ একটি শহর বা সম্প্রদায় নির্মাণ করা যাবে কি না, তা প্রযুক্তির অগ্রগতি, ব্যয়, নিরাপত্তা এবং নির্মাণ খাতের বাস্তব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। একইভাবে পরিবেশবান্ধব ভবন, চালকবিহীন গাড়ি ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যুৎব্যবস্থা কতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে, সেটিও নির্ভর করবে নীতিমালা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ওপর।
সব মিলিয়ে, ২০৫০ সালের শহর পরিকল্পনায় আবাসনের ঘনত্ব, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর নির্মাণ এবং মানুষের সামাজিক প্রয়োজনকে একসঙ্গে বিবেচনা করার প্রবণতা বাড়তে পারে। ক্রমবর্ধমান নগর জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করাই হবে এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
