বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বইটি বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা কি না, অন্য কেউ এর লেখক বা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না—এমন প্রশ্নও উঠেছে। এর মধ্যেই নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বইটির লেখকত্ব নিয়ে সন্দেহের কারণ দেখছেন না মুক্তিযোদ্ধা মেসবাহউদ্দিন আহমেদ।
মেসবাহউদ্দিনের দাবি, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশের বহু বছর আগে তিনি বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে লেখা দুটি নোটবুক দেখেছিলেন। আওয়ামী লীগের তৎকালীন কার্যালয়ের নিচতলায় ‘বাংলার বাণী’ অফিসে তিনি ও সাংবাদিক ফকির আবদুর রাজ্জাক ওই নোটবুক দুটি দেখেন।
স্মৃতিচারণায় মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন। সে সময় আওয়ামী লীগ অফিসে মানুষের আসা-যাওয়াও কমে গিয়েছিল।
এরই মধ্যে একদিন দুপুরে শেখ ফজলুল হক মনি একটি খাকি রঙের প্যাকেটে দুটি নোটবুক নিয়ে ‘বাংলার বাণী’ অফিসে আসেন। মেসবাহউদ্দিনের ভাষ্য, মনি তাঁদের জানিয়েছিলেন, প্যাকেটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ডায়েরি রয়েছে।
মেসবাহউদ্দিন বলেন, ‘মনি ভাই বললেন, এই প্যাকেটে বঙ্গবন্ধুর ডায়েরি আছে—একটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে লেখা, আরেকটি ক্যান্টনমেন্টে থাকা অবস্থায় লেখা।’
তিনি জানান, তিনি ও সাংবাদিক ফকির আবদুর রাজ্জাক দুজনই ওই দুটি নোটবুক নিজের চোখে দেখেছিলেন। শেখ ফজলুল হক মনি তাঁদের আরও বলেছিলেন, একই ধরনের আরেকটি নোটবুকও রয়েছে।
এরপর দীর্ঘ সময় ওই নোটবুকগুলোর বিষয়ে আর কোনো তথ্য তাঁর জানা ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁদের রাজনৈতিক জীবনও ভিন্ন পথে এগিয়ে যায়।
মেসবাহউদ্দিন বলেন, প্রায় দুই যুগ পর তিনি জানতে পারেন, নোটবুকগুলো ‘বাংলার বাণী’ অফিসেই পাওয়া গিয়েছিল এবং শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ভাইদের একজন সেগুলো শেখ হাসিনার কাছে দেন। তাঁর ভাষ্য, নোটবুকগুলো সেখানে সংরক্ষিত ছিল—এ কথা পরিবারের সবাইও হয়তো জানতেন না।
এনায়েতুর রহিমের সম্পৃক্ততার কথাও স্মৃতিচারণায়
মেসবাহউদ্দিন আরও বলেন, পরে তিনি শুনেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ড. এনায়েতুর রহিমকে ওই লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশের উপযোগী করে সম্পাদনা বা স্ক্রিপ্ট করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কাজটি দীর্ঘ সময় ধরে চলেছিল বলেও তিনি জানতে পারেন। পরে ড. এনায়েতুর রহিম মারা যান।
তবে বঙ্গবন্ধুর লেখাগুলো নিয়ে কাজের সঙ্গে ড. এনায়েতুর রহিমের সম্পৃক্ততার কথা অন্য প্রকাশিত বিবরণেও পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক লেখায় অনুবাদক ফকরুল আলম জানান, ২০০০ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর লেখাপত্র নিয়ে কাজ চলছিল এবং এনায়েতুর রহিম এ কাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সেখানে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বাংলা পাণ্ডুলিপি ও এর পরবর্তী অনুবাদ-প্রক্রিয়া নিয়েও বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি স্মৃতিচারণামূলক লেখায় বলা হয়েছিল, এনায়েতুর রহিম বঙ্গবন্ধুর খাতা ও হাতের লেখা বাছাইয়ের কাজে সহায়তা করেছিলেন এবং পরে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র অনুবাদের কাজও করেছিলেন।
সাম্প্রতিক বিতর্ক
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে লেখকত্বের বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৫ সালের আগস্টে বইটি ‘অন্যের লেখা’—এমন অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ওই বিতর্কে বইটি লেখার সঙ্গে সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীসহ ১২৩ জনের সম্পৃক্ততা এবং তাঁদের অর্থ ও ফ্ল্যাট দেওয়ার অভিযোগের কথাও সামনে আসে। তবে এসব ছিল অভিযোগ ও তদন্তের দাবি; অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য ওই প্রতিবেদনে নেই।
২০২৫ সালের একই সময়ের আরেক প্রতিবেদনে ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন এসব দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর চারটি খাতা পেয়েছিলেন এবং ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধুর হাতের লেখার প্রতিচ্ছবি রয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকেও বইটি ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ঢাকার বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বিক্রয়কেন্দ্রে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ রাখাকে কেন্দ্র করে হট্টগোল ও বিক্রয়কর্মীদের হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ইউপিএল এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানায়।
১ অক্টোবর প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, বইটি বিক্রি নিষিদ্ধ করার কোনো সরকারি আদেশ বা আদালতের নির্দেশের তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে গবেষণাধর্মী আলোচনা এবং বইটির ঐতিহাসিক মূল্য নিয়ে মতামতও প্রকাশিত হয়েছে।
‘হাতের লেখা দেখেছি, সন্দেহ নেই’
সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন, রাজনীতি ও তাঁর সময়ের মানুষদের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজের চেয়ে ভালো আর কে বলতে পারতেন।
তাঁর মতে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লে বঙ্গবন্ধুর কথা বলার স্বাভাবিক ভঙ্গি, ভাষা ও চিন্তার যে পরিচয় পাওয়া যায়, সেটিই বইটির লেখকত্বের বিষয়ে তাঁর কাছে বড় প্রমাণ।
তিনি স্মৃতিচারণায় ১৯৭২ সালের একটি ঘটনাও উল্লেখ করেন। দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু কয়েকজনের খোঁজ করছিলেন, যারা পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাঁদের সম্পর্কে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘জানিস না, ওরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছিল।’
মেসবাহউদ্দিনের মতে, বঙ্গবন্ধুর মুখের কথার এমন সরল ও স্বাভাবিক ভঙ্গির ছাপ তাঁর লেখার মধ্যেও রয়েছে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হাতের লেখা তিনি নিজে দেখেছেন। তাঁর গদ্য ও লেখার ধরনও দেখেছেন। তাই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বঙ্গবন্ধুর লেখা কি না—এ নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কোনো সন্দেহ নেই।
