নিজস্ব প্রতিবেদক: নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর ১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে প্রথমে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। এরপর মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এ ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এতে এক কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার। এ ঘটনায় বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন তিনি।
স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখল করার চেষ্টা করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে একটি পক্ষ ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে তা দখল করে নিয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। প্রয়াত এক কাউন্সিলরের স্ত্রী এবং বিএনপির প্রয়াত একজন এমপির বোন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের সময় পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন তাঁরা। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও স্থাপনাটি রক্ষা করতে পারেনি। পুরো ভবনটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শাহ আলী থানা-পুলিশ বলছে, মামলা হলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজ শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মিরপুর ১ নম্বর–সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ও ফেয়ার প্লাজা মার্কেটের মাঝের অংশে রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি টিকাদান কেন্দ্র অবস্থিত। কেন্দ্রের মূল ফটক তালাবদ্ধ। বাঁশ, খুঁটিসহ কিছু নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে। ফটকের ওপরে একটি সাইনবোর্ড। তাতে লেখা রয়েছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ও রেজিস্ট্রি মূলে এই প্লটের মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। জমির পরিমাণ ১০ কাঠা।’
পরে পাশের একটি গলি দিয়ে টিকাদান কেন্দ্রের পেছনের অংশে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি পাকা ও আধা পাকা ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পলেস্তারা, বাঁশ, খুঁটিসহ নির্মাণসামগ্রী ভেঙে পড়ে আছে। ভবনের কক্ষগুলোর দরজা–জানালা খুলে ফেলা হয়েছে। কয়েকটি কক্ষে দরজা থাকলেও তাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কক্ষের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র, ওষুধ, ভ্যাকসিন, ক্যাপসুল মেঝেতে পড়ে আছে। স্থাপনার এক কোনায় একটি বড় আমগাছ রয়েছে। তবে গাছের একাধিক ডাল কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। উৎসুক লোকজন জড়ো হয়ে তা দেখছেন।
টিকাদান কেন্দ্রের পাশের এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাত ১০টায় দোকান বন্ধ করে বাসায় যান তিনি। সকালে এসে দেখেন কিছুই নেই। অল্প খরচে গরিব মানুষেরা এখান থেকে টিকা দিতে পারত। অথচ এখন দেখে মনে হচ্ছে ধ্বংসস্তূপ। যারাই করুক, কাজটি ভালো করে নাই।’
৫০ বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। কেন্দ্রটির তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধাও রয়েছে। মিরপুর ১০ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কেন্দ্র হলেও মিরপুর ১, বাউনিয়াবাদ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত রয়েছে।
বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন, এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি নারী ও সমাজকর্মী তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক আমলা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ এস এম কাশেম, এ কে আজাদ এবং সাবেক সচিব আবদুল করিম ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে আছেন। প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমান, প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টি এ চৌধুরী, প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডে ছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, পাঁচ–ছয় বছর ধরে সমমনা সমবায় সমিতির নামে কিছু লোক জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে আসছিল। ২০২২ সালেও একবার চেষ্টা হয়। কিন্তু সে সময় পারেনি। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এসে সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এ হামলা করা হয়েছে।
