আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বাইরে থেকে দেখতে পেনসিলভানিয়ার পেরি স্ট্রিটের বাড়িটি ছিল আর দশটি সাধারণ আবাসের মতোই। তবে সেই চার দেয়ালের ভেতরে চলছিল এক নারকীয় বন্দিজীবন। নষ্ট শৌচাগার, অকেজো বেসিন আর মেঝেময় ছড়িয়ে থাকা দুই লিটারের শত শত প্রস্রাবভর্তি বোতল—চরম নোংরা এক পরিবেশে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে বছরের পর বছর ধরে নিদারুণ মানসিক ও শারীরিক শৃঙ্খলে আটকে রেখেছিলেন ৪৫ বছর বয়সী ম্যাথিউ স্টোন। শেষ পর্যন্ত সেই পৈশাচিক নিয়ন্ত্রণের পর্দা নামল এক রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। নিজের স্ত্রী, সন্তানসম্ভবা কন্যা ও দুই শিশুসহ আটজনকে একে একে গুলি করে হত্যার পর আত্মঘাতী হয়েছেন গৃহকর্তা ম্যাথিউ নিজে।
বৃহস্পতিবার এরি শহরের পুলিশপ্রধান রিক লোরাহ এক সংবাদ সম্মেলনে এই গা শিউরে ওঠা হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বহু বছর ধরে পরিবারের ওপর একনায়কতন্ত্র চালিয়ে আসছিলেন ম্যাথিউ। স্ত্রী ও সন্তানদের অর্থকড়ি নিয়ন্ত্রণ, কারোর সঙ্গে দেখা করার নিষেধাজ্ঞা এবং বন্ধুদের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাঁদের এক অবরুদ্ধ জগতে বন্দি করে রেখেছিলেন তিনি।
তদন্তে জানা গেছে, এই হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে করুণ শিকার ম্যাথিউয়ের ২৪ বছর বয়সী বড় মেয়ে অ্যাঞ্জেলিনা স্টোন। সোমবারই তাঁর প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভাব্য দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বাবার এই বিভীষিকাময় বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। নিজের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাড়ি ছেড়ে পালানোর সব প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি; এমনকি বাবার পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলতে আদালতে পদবি পরিবর্তনের হলফনামাও জমা দেন। সেখানে তিনি বাবার মানসিক বিকৃতির আশঙ্কার কথা লিখেছিলেন।
সন্তান প্রসবের পর হাসপাতালে নেওয়ার সুবিধার্থে তিনি তাঁর খালা লোরা লি রবার্টস (৩৭) ও পারিবারিক বন্ধু টুইলা ট্যানারকে (৫১) ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তদন্তকারীরা অ্যাঞ্জেলিনার ঘরে গোছানো ব্যাগ ও বাক্সভর্তি মালামাল দেখতে পেয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাগ গুছিয়ে সন্তানসহ পালানোর বিষয়টি টের পেয়েই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন ম্যাথিউ।
অ্যাঞ্জেলিনার পাশাপাশি ম্যাথিউয়ের গুলিতে প্রাণ হারান তাঁর ৪৪ বছর বয়সী স্ত্রী মিশেল স্টোন, দুই ছেলে ম্যাথিউ জুনিয়র (২১) ও জোনাথন (১৯), খালা লোরা ও বন্ধু টুইলা। রক্ষা পায়নি পরিবারের সঙ্গে থাকা পাঁচ ও দুই বছর বয়সী দুটি নিষ্পাপ শিশুও। সবাইকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করার পর নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন ম্যাথিউ।
তদন্তে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ২০১৯ সালে ঠিক এই ৪০ ক্যালিবারের পিস্তলটি দিয়েই স্ত্রীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ম্যাথিউ। তবে সে সময় স্ত্রী মিশেল আদালতে বক্তব্য পরিবর্তন করায় ও অভিযোগ প্রত্যাহার করায় আইনি ঝামেলা থেকে রেহাই পেয়ে যান তিনি। পাঁচ বছর আগে তুলে নেওয়া সেই একই পিস্তলটিই শেষ পর্যন্ত পুরো পরিবারটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। পুরো ঘটনাটি শহরের সামাজিক ও আইনি নজরদারির ব্যর্থতা কি না, তা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে মার্কিন মুলুকে।
