নিজস্ব প্রতিনিধি : ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সংজ্ঞা থেকে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের নাম পুরোপুরি বাদ দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা চালানো হয়েছিল। এমনকি দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল’ (জামুকা)-কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং কোনো প্রকার না জানিয়েই প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে এই সংজ্ঞার পরিবর্তনও আনা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে নেওয়া এই বিতর্কিত উদ্যোগটি জামুকার বীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের তীব্র আপত্তি, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। অনুসন্ধানে তৎকালীন সরকারের এই চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল নথির তথ্য সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ১০ মে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ও জামুকার তৎকালীন চেয়ারম্যান ফারুক-ই-আজমের সভাপতিত্বে সংস্থাটির ৯৬তম গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান (বীরউত্তম), ক্যাপ্টেন (অব.) এম নুরুল হুদা, বীর বিক্রম হাবিবুল আলম ও জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতসহ অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। সভায় উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম আকস্মিকভাবে প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, গত ৬ মে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২’ সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে ‘মুজাহিদ বাহিনী, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম’ শব্দগুলো বাদ দিয়ে পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং পাঠ্যপুস্তকেও এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
উপদেষ্টা পরিষদের এই প্রস্তাব শোনার সাথে সাথেই বৈঠকে উপস্থিত জামুকার সদস্যরা তীব্র ক্ষোভ ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান বীরউত্তম সাফ জানিয়ে দেন, “আমরা সবাই জানি কাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, আলবদর, আলশামস—এদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত ইতিহাস। আমরা ইতিহাস বিকৃতি করতে পারি না।” জামুকাকে না জানিয়ে পাঠ্যপুস্তকে সংজ্ঞা পরিবর্তনের ধৃষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মেজর (অব.) কাইয়ুম খান। আরেক সদস্য হাবিবুল আলম মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮-তেও জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে।
জামুকা সদস্যদের এমন ইস্পাতকঠিন ও অনমনীয় অবস্থানের মুখে তৎকালীন উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন এবং উপদেষ্টা পরিষদের মূল এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে সদস্যদের তীব্র আপত্তির মুখে রফা নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত হয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর নাম বাদ দেওয়া যাবে না, তবে নামের পূর্বে ‘তৎকালীন’ শব্দ যোগ করা যেতে পারে। সেই আলোকেই ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত হয়, যা পরবর্তীতে গত ১০ এপ্রিল ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাস হয়।
উল্লেখ্য, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী আইনে যেখানে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী, জামায়াত, মুসলিম লীগ ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বলা হয়েছিল, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশোধিত সংজ্ঞায় বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দেওয়ার পাশাপাশি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার কথা যুক্ত করে দলগুলোর নামের আগে ‘তৎকালীন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা পরিষদের এই গোপন এজেন্ডা ও ইতিহাস পরিবর্তনের চেষ্টা ব্যর্থ করার ঘটনাটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আপসহীনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
