নিজস্ব প্রতিনিধি : সারাদেশে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানাবিধ অপরাধের গ্রাফ আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হলেও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশি তৎপরতা দৃশ্যমান বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নগরবাসী।
বিশেষ করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে ১৮ হাজার পুলিশ মোতায়েনের ঘোষণা এই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে।
ডিএমপির মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত সাড়ে পাঁচ মাসে শুধু ঢাকা শহরেই খুনের ঘটনা ঘটেছে ৯৮টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ১৭টি, মে মাসে ১৬টি এবং চলতি জুনের প্রথম ১৫ দিনেই ৪টি খুনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্বশত্রুতা কাজ করলেও, প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে ছিনতাই, দস্যুতা এবং বাসা-বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঢাকাবাসীর মনে চরম আতঙ্ক ও অস্বস্তি তৈরি করেছে।
খুনের পাশাপাশি নগরীতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ। ডিএমপির তথ্য বলছে, গত এপ্রিল মাসেই রেকর্ড ৭০টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। এছাড়া জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে যথাক্রমে ৩৮টি, ৩৭টি এবং ৫৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মে মাসেও এই সংখ্যা ছিল ৫৬টি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, লোকলজ্জা ও সামাজিক চাপের কারণে বহু ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে, ফলে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা নথির চেয়েও অনেক বেশি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে মব জাস্টিস, সহিংসতা ও অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। উপরন্তু, বিভিন্ন সময়ে কারাগার ভেঙে ও বিশেষ প্রক্রিয়ায় দুর্ধর্ষ অপরাধী, জঙ্গি ও ফাঁসির আসামিদের মুক্তি পাওয়ার ঘটনা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ।
জনগণের এমন নিরাপত্তাহীনতার মাঝেই আগামীকাল ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে ডিএমপি। গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক ‘জরুরি বার্তা’র পর রোববার আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়, মঙ্গলবার ঢাকায় ১৮ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রাজধানীর প্রবেশদ্বারসহ দুই শতাধিক কৌশলগত পয়েন্টে বিশেষ পিকেট ও কড়া চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। নিয়মিত ফোর্সের পাশাপাশি ডিবির বিশেষায়িত ইউনিট, সিটিটিসি এবং সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও আইএডি সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে। যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি)।
সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের দাবি, এই দিনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ব্যানার নিয়ে রাজপথে মিছিল করার চেষ্টা করলে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সাথে বড় ধরনের সংঘাত ও নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, দেশের মূল আইন-শৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনের চেয়ে সরকারের সমস্ত শক্তি ও মনোযোগ এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মাঠ থেকে নির্মূল করার পেছনেই ব্যয় হচ্ছে।
