চব্বিশের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণে ২০২৬ সালের মে ও জুন মাসে এসে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। একদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক চিরুনি অভিযানে নিষিদ্ধঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের হার ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে; অন্যদিকে আত্মগোপনে থাকা সংগঠন দুটির আকস্মিক ঝটিকা শো-ডাউনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। মানবাধিকার সংস্থা ও পুলিশ প্রশাসনের সাম্প্রতিক তথ্যে মে ও জুন মাসের এই গ্রেফতার এবং সহিংসতার এক চিত্র ফুটে উঠেছে।
মে-জুনে দেশজুড়ে মেগা গ্রেফতার অভিযান
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র্যাব ও যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে অন্তত ১ হাজার ৯৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই গ্রেফতারকৃতদের একটি বড় অংশই ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জেলা, মহানগর ও থানা কমিটির প্রথম সারির নেতাকর্মী।
জুন মাসের প্রথম দুই সপ্তাহেও এই গ্রেফতার অভিযানের গতি কমেনি। বিশেষ করে সাভার, চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী ও দেশের বড় বড় বিভাগীয় শহরগুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতার পুরোনো মামলা, চাঁদাবাজি ও গণ-অভ্যুত্থানকালীন নাশকতার অভিযোগে মধ্যরাতের চিরুনি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। দলটির বহু নেতাকর্মী এখনো দেশের বাইরে পালানোর চেষ্টা করছেন কিংবা সীমান্ত এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন।
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্রলীগের ‘শো-ডাউন’ ও সংঘাত
চলতি জুনের শুরুতে আইনি ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মাঠ গরম করার চেষ্টা করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কেন্দ্রীয় গোপন নির্দেশনার পর দেশের অন্তত অর্ধশতাধিক (৫০টিরও বেশি) পয়েন্টে গভীর রাতে কিংবা ভোরের আলো ফোটার আগে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা একযোগে সক্রিয় অবস্থান নেন এবং ঝটিকা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটের অলিগলিতে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দেওয়া এই শো-ডাউনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনতার সঙ্গে বেশ কিছু জায়গায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এই ঝটিকা মিছিলগুলো রুখতে পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা তৎপরতা আরও কঠোর করা হয়েছে।
রাজনৈতিক কোন্দল ও মব জাস্টিসের ভয়ংকর থাবা
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, মে মাসে সারা দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যাতে ৫ জন নিহত এবং অন্তত ২৮৯ জন গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে যেমন ছিল আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে চালানো আক্রমণ, তেমনই ছিল স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক আবহের সুযোগে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির ঘটনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। মে মাসেই ৬৬টি গণপিটুনির ঘটনায় ৩১ জন নিহত হয়েছেন। চুরির অপবাদ, রাজনৈতিক সন্দেহ কিংবা স্রেফ গুজব ছড়িয়ে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে মারার এই সংস্কৃতি জুন মাসেও অব্যাহত রয়েছে, যা রাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের চরম আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেয়।
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ঢালাও গ্রেফতার এবং আত্মগোপনে থাকা সিন্ডিকেটের গোপন তৎপরতার কারণে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। একদিকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যায়ে এখনো শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিতে চোরাগোপ্তা আন্দোলন বেগবান করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসন ও যৌথ বাহিনী যেকোনো মূল্যে বিশৃঙ্খলা এড়াতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর মাঝেই মব জাস্টিস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠিন ও জটিল রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
