নিজস্ব প্রতিনিধি : জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে ছবি তোলার ক্যামেরা ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অবিশ্বাস্য দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এই ঘটনাটি ঘটেছে সদ্য বিদায় নেওয়া সচিব কানিজ মাওলার তত্ত্বাবধানে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর এটিই সংসদ সচিবালয়ের প্রথম বড় কেনাকাটা বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাত্র ৪ হাজার টাকা বাজারমূল্যের একটি সাধারণ ব্যাগের দাম ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা। ব্র্যান্ডের নাম লেখা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের ব্যাগ, যাতে লোগো লাগানো হয়েছে আলাদাভাবে। একইভাবে ৩ হাজার টাকার কার্ড রিডারের দাম নেওয়া হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা। ক্যামেরার প্রধান যন্ত্রাংশ তথা বডির ক্ষেত্রেও ঘটেছে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা। ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার ডিজিটাল স্টিল এসএলআর ক্যামেরার বডির দাম ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকা।
সব মিলিয়ে ছবি তোলার জন্য ১২টি আইটেমের যে সেট কেনা হয়েছে, তার জন্য সরকারের কাছ থেকে বিল নেওয়া হয়েছে ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ১৩০ টাকা। অথচ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব যন্ত্রপাতির প্রকৃত বাজারমূল্য সব মিলিয়ে ২০ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এই কেনাকাটার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ৩০ দিনের নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মালামাল সরবরাহ করে বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
কেনাকাটার তালিকায় থাকা ২৪-৭০ এমএম ফোকাল লেন্থের তিনটি লেন্স কেনা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার টাকায়, যার প্রতিটির দাম নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টাকা। অথচ বাজারে এর সর্বোচ্চ দাম ৭৮ হাজার টাকা। একইভাবে ১ লাখ টাকার লেন্স ২ লাখ ১০ হাজারে এবং ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার লেন্স ৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অসংগতি দেখা গেছে স্পিডলাইট বা ফ্ল্যাশের ক্ষেত্রে, যেখানে ১০-১৫ হাজার টাকার প্রতিটি ফ্ল্যাশের দাম দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৫০ টাকা।
নিক্কন ব্যান্ডের জাপানি মালামাল দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের ‘সিমপেক্স’ কোম্পানির মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি ৯০০ থেকে ১২০০ টাকার ব্যাটারির দাম ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সরবরাহ করা মালামালের মান এতটাই খারাপ যে দেখে মনে হয় এগুলো রাজধানীর স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে খুচরা কিনে লোগো বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই মালামাল সরবরাহ করেছে ‘সেফ ট্রেডার্স’ নামে মগবাজারের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার মিরাজুল ইসলাম বাজারমূল্যের পার্থক্যের বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি কেবল জানান যে, সরকারি কেনাকাটায় এমন দাম অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে সংসদ সচিবালয়ের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ফটোগ্রাফাররা বলছেন, ১০ লাখ টাকার মধ্যেই যেখানে বিশ্বমানের সেট পাওয়া সম্ভব, সেখানে ৫৮ লাখ টাকা খরচ করা স্পষ্টতই একটি পরিকল্পিত লুটপাট।
কার্যাদেশে স্বাক্ষরকারী সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মহিদুল হক এই অনিয়মের দায় এড়িয়ে বলেছেন যে, তিনি নতুন যোগদান করায় পূর্ববর্তী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে, নেপথ্যে থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে সাবেক সচিব কানিজ মাওলার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তড়িঘড়ি করে নিয়মের বেড়াজালে সব নথিপত্র সাজিয়ে এই ‘হরিলুট’ সম্পন্ন করেছেন।
