দেশে একযোগে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও পাইপলাইন প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এলপিজির সরবরাহ ঘাটতির কারণে বাজারে সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অন্যদিকে তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন দুর্ঘটনার কারণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এলপিজি সংকটের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন গৃহস্থালি গ্রাহকরা। এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় রান্নার কাজে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাজারে তা ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবুও অনেক এলাকায় এই দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
চলমান সংকট নিয়ে গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাসিক এলপিজির চাহিদা গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টন। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয় প্রায় ১৫ হাজার টন। তবে গত মাস থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, ফলে বহু এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মো. সিরাজুল মাওলা বলেন, এলপিজি সংকট পরিবহন খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশে দেড় লাখের বেশি এলপিজিচালিত যানবাহন রয়েছে। গ্যাস না পেয়ে চালক ও মালিকেরা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরেও জ্বালানি পাচ্ছেন না।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. হাসিন পারভেজ জানান, যানবাহন খাতে মোট এলপিজির মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার হলেও সেটুকুও নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে না। দীর্ঘদিন স্টেশন বন্ধ থাকায় মালিকেরা কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি ও পরিচালন ব্যয় দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা অবিলম্বে এলপিজি আমদানি স্বাভাবিক করার দাবি জানান।
অন্যদিকে ঢাকায় পাইপলাইন গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে তিতাসের একাধিক দুর্ঘটনায়। গত ৪ জানুয়ারি আমিনবাজারে পাইপলাইনে ছিদ্রের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। এর মধ্যে শনিবার মিরপুর রোডে গণভবনের সামনে পাইপলাইনের একটি ভালভ ফেটে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। মেরামতের জন্য আশপাশের কয়েকটি ভালভ বন্ধ করে দিতে হয়।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভালভ পরিবর্তনের পর ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। তবে পাইপলাইনে ঢুকে পড়া পানি পুরোপুরি পরিষ্কার করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ, গাবতলীসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কামরুন্নেছা রুহী জানান, লাইনে গ্যাস না থাকায় এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সিলিন্ডার না পেয়ে বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎচালিত চুলা কিনতে হয়েছে।
সিএনজি খাতেও প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট গ্যাস ব্যবহারের মাত্র ৫ শতাংশ পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সিএনজি স্টেশনগুলো চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছে না। কম চাপে একটি গাড়িতে গ্যাস ভরতে যেখানে পাঁচ মিনিট লাগার কথা, সেখানে এখন সময় লাগছে আধা ঘণ্টার বেশি।
সরকার ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে এলপিজি আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।