বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি পুনরায় গুরুতর আকার নিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, আয়ের হ্রাস, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাব এই ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়েছে।
বিশেষত নিম্ন আয়ের পরিবার, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, গ্রামীণ কৃষক, নারী এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় আছে।
গতকাল রাজধানীর গুলশানের আমারি হোটেলে বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যান্ড ইকুইটি অ্যাসেসমেন্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সংস্থার মতে, কভিড-১৯ মহামারির আগে দারিদ্র্য হ্রাসের যে গতিশীলতা ছিল, তা মহামারি এবং পরবর্তী বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
যাদের আয়ের উৎস স্থির বা সীমিত, তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেও হিমশিম খাচ্ছে। শহরে দরিদ্র পরিবারগুলো বাড়তি ভাড়া, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে বেশি চাপের মুখে। গ্রামে কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ক্ষতির ফলে আয় কমে যাওয়ায় দারিদ্র্য আরও বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখন ‘নতুন দরিদ্র’, যারা আগে দারিদ্র্যসীমার উপরে ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাত, যা দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান বহন করে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এখানে কর্মীদের অধিকাংশের চাকরির নিরাপত্তা নেই এবং সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাও কম। মহামারি-পরবর্তী সময়ে নারীদের কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার ধীর হয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে দারিদ্র্য আরও তীব্র। উপকূলীয় এলাকা, চরাঞ্চল, নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চল ও খরাপীড়িত উত্তরাঞ্চলের মানুষ নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছোট কৃষক ও মৎস্যজীবীরা পুনরায় দারিদ্র্যতে আটকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, জলবায়ু অভিযোজন এবং সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
তবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তৃত আওতা থাকা সত্ত্বেও কার্যকারিতা কম। অনেক প্রকৃত দরিদ্র এখনও সুবিধা থেকে বঞ্চিত। রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতার কারণে নগর দরিদ্ররা প্রায় কোনো সুবিধা পান না।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সম্ভব হলেও কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ছাড়া দারিদ্র্য মোকাবেলা কঠিন। রেমিট্যান্স প্রবাহ, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
প্রধান অতিথি পিপিআরসির চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ২০২২-২৫ সময়কালে দারিদ্র্য প্রায় ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, যার মধ্যে ১৫ লাখ নারী। সিপিডির ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শহরে আয়বৈষম্য বেশি, গ্রাম থেকে শহরে সম্পদ স্থানান্তরিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জেঁ পেসমে বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা, জলবায়ু দুর্বলতা ও ধীর কর্মসংস্থান দারিদ্র্য হ্রাসকে বাধাগ্রস্ত করছে। নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তরুণরা কম আয়ের কাজে বাধ্য হচ্ছেন।
সিনিয়র ইকোনমিস্ট সার্জিও অলিভিয়েরি বলেন, উদ্ভাবনী নীতি, উন্নত সংযোগ, মানসম্মত নগর কর্মসংস্থান, কৃষিভিত্তিক দরিদ্রবান্ধব ভ্যালু চেইন ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা গ্রহণ করলে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি পুনরায় ত্বরান্বিত হবে।
