১১ মাস আগে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে, এবার গুলি করে হত্যা; দুই ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যে ‘তদন্তের’ কথা
নেত্রকোনায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের জীবনে নেমে এসেছিল দুই দফা সশস্ত্র হামলা। প্রথমবার চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছিল তাঁকে। প্রায় ১১ মাস পর এবার গুলি করে হত্যা করা হলো এই সাংবাদিককে। প্রথম হামলার পর পুলিশ জানিয়েছিল, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ঘটনায়ও পুলিশের বক্তব্য, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। এক হামলা থেকে বেঁচে ফিরলেও শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারালেন লুৎফুজ্জামান।
২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্ব পালনকালে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে হামলার শিকার হয়েছিলেন তিনি। আর ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর, তারেক রহমানের শাসনামলে, গুলিতে নিহত হলেন এই সাংবাদিক। দুই ঘটনার ব্যবধান প্রায় ১১ মাস।
গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে কলমাকান্দা পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া বাজারে একটি চায়ের দোকানের সামনে লুৎফুজ্জামানকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করতেন তিনি।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার রাতে লুৎফুজ্জামান তেলনজিয়া বাজারের একটি দোকানে চা পান করে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় দুই যুবক এসে প্রথমে তাঁর কাছে সিগারেট চান। এরপর তাঁকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়েন। গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা কিছুটা দূরে রাখা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান।
পরে স্থানীয় লোকজন লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান জানান, তাঁর মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করেন। হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে হত্যার কারণ এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
১১ মাস আগে চাপাতি দিয়ে হামলা
লুৎফুজ্জামানের ওপর প্রথম হামলাটি হয়েছিল ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দুপুরে। নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুটি মোটরসাইকেলে করে আসা চার ব্যক্তি তাঁকে ও তাঁর সহকর্মী শাহজাহান শেখকে ঘিরে ধরেন। তাঁদের মধ্যে দুজন চাপাতি দিয়ে লুৎফুজ্জামানকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন।
এতে তাঁর দুই হাত, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। তাঁর বাঁ হাতের আঙুল ও ডান হাতের রগ কেটে যায়। সহকর্মী শাহজাহান শেখ বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান।
আহত লুৎফুজ্জামানকে প্রথমে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল তাঁকে।
পরদিন ১১ নভেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঘটনায় তখন পর্যন্ত থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। দুর্গাপুর থানার তৎকালীন ওসি মাহমুদুল হাসান জানিয়েছিলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
লুৎফুজ্জামানের সহকর্মী শাহজাহান শেখ তখন সংবাদ প্রকাশের জেরে হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিলেন। তবে হামলার পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
দুই ঘটনায় দুই ওসি, বক্তব্যে একই কথা
প্রথম হামলার পর তৎকালীন ওসি মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য ছিল, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। প্রায় ১১ মাস পর একই সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার ঘটনায় বর্তমান ওসি খন্দকার শাকের আহমদ খানের বক্তব্যেও এসেছে একই কথা—বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
দুই ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় ১১ মাস। প্রথমবার চাপাতির আঘাতে গুরুতর আহত হয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন লুৎফুজ্জামান। এবার গুলিতে তাঁর মৃত্যু হলো। আগের হামলার তদন্ত কত দূর এগিয়েছিল, হামলাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল কি না কিংবা কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে আগের হামলার তদন্তের ফলাফল বা ওই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বিস্তারিত তথ্য নেই। ফলে আগের হামলা ও সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লিখতেন
সাংবাদিকতার পাশাপাশি লুৎফুজ্জামান ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি। আগের হামলার পর তাঁর সহকর্মী সংবাদ প্রকাশের জেরে হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিলেন।
তবে সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাঁর সাংবাদিকতা বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেদন দায়ী কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। পুলিশও হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে আগের হামলার সম্ভাব্য কারণ এবং বর্তমান হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
একই সাংবাদিকের ওপর প্রথমে চাপাতি দিয়ে হামলা এবং প্রায় ১১ মাস পর গুলি করে হত্যার ঘটনা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে আগের হামলার তদন্তের অগ্রগতি এবং সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথম হামলার পর তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর লুৎফুজ্জামানকে আরেকটি সশস্ত্র হামলায় প্রাণ হারাতে হলো। আগের ঘটনার তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছিল, তা স্পষ্ট না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
লুৎফুজ্জামান নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। প্রায় ছয় বছর আগে তিনি তেলনজিয়া গ্রামের আনন্দিতা সংমাকে বিয়ে করেন। তাঁদের চার বছর বয়সী একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।
চাপাতির কোপে গুরুতর আহত হওয়ার পরও বেঁচে ফিরেছিলেন লুৎফুজ্জামান। কিন্তু প্রায় ১১ মাস পর গুলিতে শেষ হলো তাঁর জীবন। এখন হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং আগের হামলার তদন্তের অগ্রগতি স্পষ্ট করার দাবি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
