লেখকঃআনিস আলমগীর
আজকের পত্রিকার খবর হচ্ছে, তুলনামূলক কম দামে পোশাক সরবরাহ করেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হারাচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের একই সময়ে তা সাড়ে ৪ শতাংশ কমে নেমে এসেছে ৫৩৯ কোটিতে, যা ভিয়েতনামের রপ্তানির অর্ধেক। এগিয়ে আছে শুল্কের চাপে থাকা চীনও। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, দ্বিতীয় স্থানে চীন এবং শীর্ষে ভিয়েতনাম।
অথচ চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইউনূস বলেছিল, “এই চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক সুবিধা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার জন্য একটি কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।”
তার প্রেস সচিব ডাস্টবিন শফিক বলেছিল, “আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ইউএসএ (USA) কেন, পুরো ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে আরও বাড়বে, কমবে না।”
তারেক রহমান ইউনূসের রেখে যাওয়া ওই লোককে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন।
ইউনূস আরেকটা বাটপারকে এনেছে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য। ঢোল পিটিয়ে সেমিনার করে সে অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে। তারেক রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা রেখে দিয়েছেন।
বিদেশি বিনিয়োগ দূরের কথা, সে দেশের বিনিয়োগ এখন বিদেশির হাতে তুলে দিয়েছে। আজ চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) ১৫ বছরের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের DP World-এর পরিচালনায় দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে।
নিজের তৈরি লাভজনক দোকান মালামালসহ আরেকজনকে ব্যবসা করতে দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
প্রশ্ন উঠেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের সোনার ডিম পাড়া হাঁস কি তবে বিদেশিদের হাতেই চলে গেল?
সাধারণত বিদেশি বিনিয়োগ আনা হয় নতুন কোনো টার্মিনাল বানানোর জন্য (গ্রিনফিল্ড প্রজেক্ট)। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি যে টার্মিনালটি একাই বন্দরের ৪৪% কনটেইনার হ্যান্ডেল করে- সেটি কেন বিদেশি কোম্পানির হাতে সঁপে দেওয়া হচ্ছে?
কেন এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? চলুন দেখে নিই প্রধান ক্ষতিকারক ও আশঙ্কার দিকগুলো:
১. তৈরি ও লাভজনক সম্পদ হস্তান্তর: সাধারণত বিদেশি বিনিয়োগ আনা হয় নতুন কোনো টার্মিনাল বা অবকাঠামো গড়ার জন্য (গ্রিনফিল্ড প্রজেক্ট)। অথচ এনসিটি হলো প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করা দেশের সবচেয়ে সচল ও লাভজনক টার্মিনাল- যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪% হ্যান্ডেল করে। তৈরি দোকান মালামালসহ অন্যকে ব্যবসা করতে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
২. পণ্যমূল্য ও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি: বর্তমানে এনসিটিতে প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ প্রায় ১০০ ডলার। বিদেশি সংস্থা তাদের মুনাফা বাড়াতে বিশ্ববাজারের মতো (১৪০-১৬০ ডলার) চার্জ বাড়িয়ে দিলে আমদানি-রপ্তানি খরচ বাড়বে। আর তার চূড়ান্ত ধাক্কা এসে পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে- বাড়বে মূল্যস্ফীতি।
৩. হাজারো শ্রমিকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ: বর্তমানে টার্মিনালটিতে প্রায় ২ হাজারের বেশি দেশীয় শ্রমিক ও কর্মকর্তা কর্মরত। প্রযুক্তির দোহাই বা অটোমেশনের কারণে তাদের বড় একটি অংশ চাকরি হারানোর বা বৈষম্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
১. জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব: বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। মূল টার্মিনালের পরিচালন নিয়ন্ত্রণ বিদেশি শক্তির হাতে থাকা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময়ে দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
২. দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ: দেশীয় ব্যবস্থাপনায় গত কয়েক বছরে এই টার্মিনালের কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৮% বেড়েছে। দীর্ঘ মেয়াদের জন্য পরিচালন ভার বিদেশিদের হাতে সঁপে দিলে আমাদের নিজস্ব বন্দর প্রকৌশলী ও পরিচালকদের বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন আমরাও চাই, তবে তা জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে নয়। বিষয়টি নিয়ে আপনার ভাবনা কী, জানান।
পুনশ্চ: চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত জনগণের সামনে প্রকাশ করা হোক। কত টাকা বাংলাদেশ পাবে, কত টাকা বিদেশি অপারেটর পাবে, বর্তমান আয়ের তুলনায় বাংলাদেশের প্রকৃত লাভ কত, শ্রমিকদের কী নিশ্চয়তা আছে এবং ১৫ বছরে দেশের মোট লাভ-ক্ষতির হিসাব কী – সবকিছু প্রকাশ্যে আসা দরকার।
কারণ বন্দর শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়।
বন্দর দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। আর লাইফলাইনের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই।
