ফোরটিন ডেস্ক : পদ্মা নদী থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনে ঢাকার বছিলা মেইন রোডের একটি ঠিকানা দেওয়া হলেও সরেজমিনে সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরাও ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের কথা জানেন না।
এর মধ্যেই পদ্মা সেতুর কাছাকাছি এলাকা থেকে ৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটের বেশি বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, যে এলাকায় বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার কাছেই নদীভাঙন রোধে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলে নদীর গতিপথ ও তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পদ্মা সেতুর কাছে বিপুল বালু উত্তোলনের উদ্যোগ
গত ৪ মে ‘আইকনিক সোর্সিং’-এর প্রোপ্রাইটার হিসেবে পরিচয় দেওয়া সৈয়দ সাদাব মাহবুব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, বিআইডব্লিউটিএতে পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলনের আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, পদ্মা সেতুর মূল ঠিকাদারের ক্রেন চলাচল এবং পলি অপসারণের জন্য দেশীয় ড্রেজার দিয়ে একটি চ্যানেল তৈরি করা হবে। নিজস্ব অর্থায়নে এই কাজ করার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে বালি বা মাটির নির্ধারিত ফি সরকারকে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
তবে উত্তোলন করা বালু কোথায় ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে আবেদনে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়, বালু বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এদিকে বিআইডব্লিউটিএ এ বিষয়ে অনাপত্তি দিয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি ওই অনাপত্তির নথিতে সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রাতে স্বাক্ষরের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
আবেদনের ঠিকানায় নেই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব
‘আইকনিক সোর্সিং’-এর ব্যবহৃত প্যাডে প্রতিষ্ঠানের অফিসের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ১১৫/১ বছিলা মেইন রোড, ঢাকা। তবে ওই প্যাডে প্রতিষ্ঠানের কোনো ওয়েবসাইটের ঠিকানা বা বিস্তারিত পরিচয় নেই। প্রতিষ্ঠানটির মোবাইল নম্বরও বর্তমানে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
সরেজমিনে বছিলা মেইন রোডে গিয়ে ১১৫/১ নম্বর কোনো হোল্ডিংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সেখানে ১১৫ নম্বর হোল্ডিংয়ে টিনের তৈরি কয়েকটি ছোট দোকান, লাইব্রেরি, মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ও চায়ের দোকান রয়েছে।
স্থানীয় হাফসা টেলিকমের মালিক মিয়া হোসেন জানান, ১১৫/১ নামে কোনো হোল্ডিং নেই। ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামের কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেও তিনি কখনো শোনেননি।
অর্থাৎ যে ঠিকানা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি দপ্তরে বালু উত্তোলনের অনুমতির জন্য আবেদন করেছে, সরেজমিন অনুসন্ধানে সেখানে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
অনুমতির প্রক্রিয়ায় অবস্থান বদল
বালু উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে শুধু বিআইডব্লিউটিএর অনাপত্তি নয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে বিআইডব্লিউটিএর অনাপত্তি বাতিলের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পরে সম্প্রতি একই মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটিকে বালু উত্তোলনের বিষয়ে সম্মতি জানিয়ে আরেকটি চিঠি দিয়েছে।
ওই চিঠিগুলোতে কাটার সাকশান ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের শর্ত দেওয়া হয়েছে। তবে ‘আইকনিক সোর্সিং’ এ ধরনের ড্রেজার কোম্পানি হিসেবে বিআইডব্লিউটিএতে নিবন্ধিত নয় বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
৫২৭ কোটি টাকার নদীভাঙন প্রকল্পের পাশে বালু উত্তোলন
পদ্মা সেতুর ভাটিতে নদীভাঙন রোধে বর্তমানে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
গত ৯ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখলাক উল জামিল জেলা প্রশাসককে দেওয়া এক চিঠিতে প্রকল্পটির বিস্তারিত তুলে ধরেন।
চিঠিতে বলা হয়, লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় নদীভাঙন ঠেকাতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর ভাটিতে প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদীতীর ভাঙনপ্রবণ। এর মধ্যে ৯ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের জন্য প্রকল্পের কাজ চলছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ড্রেজিংয়ের আওতায় থাকা চরটি এরই মধ্যে নদীর গতিপ্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে বিলীন হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রেও নদীভাঙনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে জানানো হয়।
এ অবস্থায় ওই এলাকায় বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে চলমান নদীভাঙন রোধ প্রকল্পের ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কর্মকর্তাদের আশঙ্কা নদীভাঙন বাড়তে পারে
বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি যাচাই করতে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।
কারিগরি কমিটির প্রধান এবং লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু জানিয়েছেন, কিছু বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি তাদের ফাইন্ডিংস জমা দিয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার কমিটির নেই।
কমিটি কী ধরনের সুপারিশ করেছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।
অন্যদিকে স্থানীয় পুলিশ, মৎস্য বিভাগ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বালু উত্তোলনের নামে অপরিকল্পিতভাবে খনন করা হলে নদীভাঙন বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে।
পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন দুজন প্রকৌশলীও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, একই জায়গা থেকে দেশীয় প্রযুক্তির ড্রেজার দিয়ে দীর্ঘ সময় বালু উত্তোলন করা হলে নদীর তলদেশে গভীর খাদ তৈরি হতে পারে। এতে আশপাশের নদীতীরে ভাঙনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাঁদের আশঙ্কা, পদ্মা সেতুর কাছাকাছি এলাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য
মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী জানিয়েছেন, ‘আইকনিক সোর্সিং’ বালু উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছে। আইনগতভাবে অনুমোদন দেওয়া সম্ভব কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এখনো কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসক বলেন, পদ্মা সেতু একটি কেপিআই বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। একই সঙ্গে এলাকাটি নদীভাঙনপ্রবণ। ফলে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি আরও জানান, বিআইডব্লিউটিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
আইন কী বলছে
বিষয়টি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ জানিয়েছেন, আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী বালুমহাল ঘোষণা করে টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারাদার নির্ধারণ করার বিধান রয়েছে। এ কার্যক্রম স্থানীয় জেলা প্রশাসন পরিচালনা করে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানকে এভাবে সরাসরি বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকারি কোনো প্রকল্পের উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
যোগাযোগে মিলছে না আবেদনকারীর পক্ষ
‘আইকনিক সোর্সিং’-এর হয়ে সরকারি দপ্তরে অনুমোদনের চেষ্টা করছেন সৈয়দ সাদাব মাহবুবের ভাই হিসেবে পরিচয় দেওয়া কাজী মো. লিয়াকত।
তাঁর সঙ্গে কয়েক দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সৈয়দ সাদাব মাহবুবের মোবাইল নম্বর কিংবা প্রতিষ্ঠানটির সঠিক ঠিকানা দিতে রাজি হননি।
ভুয়া ঠিকানা ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী মো. লিয়াকত বলেন, ‘যেই মাধ্যমে আপনি তথ্য পাচ্ছেন, তারাই ভালো বলতে পারবে।’
সব মিলিয়ে পদ্মা সেতুর কাছাকাছি এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের এই উদ্যোগ ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ও অস্তিত্ব, বালু ব্যবহারের উদ্দেশ্য, ড্রেজার ব্যবহারের বৈধতা, নদীভাঙনের ঝুঁকি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হয়নি। কারিগরি কমিটির ফাইন্ডিংস, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএর মতামত এবং আইনগত যাচাইয়ের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
