নিজস্ব প্রতিবেদক, গত ৯ মাসে সৌদি আরব থেকে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ট্রমা নিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন ৯৭৯ জন নারী রেমিট্যান্স যোদ্ধা।ফিরে আসা এই নারীদের প্রায় প্রত্যেকেই কর্মস্থলে সুনির্দিষ্টভাবে পাশবিক যৌন নিপীড়ন তথা ধ*র্ষণের শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, দ্বিপাক্ষিক আইনি জটিলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে ভুক্তভোগীদের একজনও কোনো ধরনের বিচারিক প্রতিকার বা আইনি সহায়তা পাননি।
চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী শ্রমিক সম্পূর্ণ শূন্য হাতে এবং আউটপাসের মাধ্যমে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। প্রত্যাবাসিত নারীদের সিংহভাগ—৫৮.৬২ শতাংশই সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন। ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি ও চিকিৎসা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে মানবাধিকার গবেষকরা জানিয়েছেন, সেখানে প্রচলিত ‘কাফালা’ বা কফিল প্রথার সুযোগ নিয়ে নিয়োগকর্তারা তাদের পাসপোর্ট জব্দ করে বহিরাগত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এর ফলে দিনের পর দিন অবরুদ্ধ রেখে চালানো এই পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বেশ কয়েকজন নারী সম্পূর্ণ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) নির্দেশিত বাধ্যতামূলক শ্রম এবং আধুনিক দাসত্বের (Modern Slavery) স্পষ্ট লঙ্ঘন।
ফেরত আসা নারী গৃহকর্মীদের ৯৪ শতাংশই নিয়মিত পদ্ধতিগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে সরাসরি ধর্ষণের হার ৪৭ শতাংশের বেশি। কর্মঘণ্টার কোনো সীমারেখা না থাকায় প্রায় ৮২ শতাংশ নারীকে দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা দাসবৃত্তিতে বাধ্য করা হতো। নির্যাতনের শিকার কর্মীরা যখন রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের ‘সেফ হোম’ কিংবা স্থানীয় সৌদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছেন, তখন উল্টো কফিলদের পক্ষ থেকে চুরির মিথ্যা পাল্টা মামলা দায়ের এবং স্থানীয় পুলিশের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে সম্পূর্ণ বিচারহীনতার এক চক্র তৈরি হয়েছে, যেখানে বিচারপ্রার্থী নারীকেই অপরাধী হিসেবে বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের (যেমন ফিলিপাইন বা ইন্দোনেশিয়া) নারী শ্রমিকরা যেখানে ডরমিটরি বা হোস্টেলভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষায় কাজ করেন, সেখানে বাংলাদেশের নারীদের সরাসরি একক গৃহের অভ্যন্তরে অরক্ষিত অবস্থায় নিয়োগ দেওয়াকে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দুর্বলতা এবং দেশীয় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জবাবদিহিতার অভাব এই পদ্ধতিগত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে জিইয়ে রেখেছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা তাৎক্ষণিকভাবে তিনটি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন—প্রথমত, গৃহভিত্তিক কর্মসংস্থান বাতিল করে আবাসনভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজার তৈরি করা; দ্বিতীয়ত, কফিলদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সৌদি সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুযায়ী কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা; এবং তৃতীয়ত, দেশে ফেরা নারীদের আইনি প্রতিকারের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ উইং গঠন করা। একই সাথে, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে অবিলম্বে একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
