নিজস্ব প্রতিবেদক, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে, সুদ পরিশোধে বাড়ছে বাজেটের চাপ; ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর তাগিদ
বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা—এমন হিসাব সামনে রেখে দেশের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাথাপিছু সরকারি ঋণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা ১৯ পয়সা। অর্থাৎ ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকার হিসাবটি নির্দিষ্ট সময়ের তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান। সংসদ সদস্য রেজা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাথাপিছু ঋণের চাপ কমাতে সরকারের নিজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মোট সরকারি ঋণ ২২ লাখ কোটি টাকার বেশি
চলতি বছরের ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারি ঋণের বড় একটি অংশ বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া হয়েছে।
এই ঋণের মধ্যে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণ এবং বিদেশি সরকার, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা ও অন্যান্য ঋণদাতার কাছ থেকে নেওয়া ঋণ। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের প্রয়োজন মেটাতে ঋণ নেওয়া হয়। তবে ঋণের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেই বিনিয়োগ থেকে ভবিষ্যতে কতটা আয় বা অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মাথাপিছু ঋণ মানেই ব্যক্তিগত ঋণ নয়
মাথাপিছু সরকারি ঋণের হিসাব শুনে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—প্রত্যেক নাগরিককে কি সরকারকে সরাসরি এই টাকা পরিশোধ করতে হবে?
এর উত্তর হলো, না। মাথাপিছু ঋণ হচ্ছে দেশের মোট সরকারি ঋণকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া গড় হিসাব। এটি কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত ঋণ নয়। সরকার বাজেটের রাজস্ব আয়, কর, অন্যান্য সরকারি আয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করে।
তবে সরকারি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের অর্থ আসে রাষ্ট্রের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা থেকে। ফলে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এই চাপ কতটা হবে, তা নির্ভর করে সরকারের আয়, ব্যয়, ঋণের শর্ত ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।
সুদ পরিশোধ বড় চ্যালেঞ্জ
সরকারি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উচ্চ সুদে নেওয়া অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার, বিনিময় হার ও পরিশোধের সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দ্য ডেইলি স্টারের ৫ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। ওই সময় ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।
এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির অর্থ হলো, সরকারের রাজস্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। তবে সুদের ব্যয় বাড়লেই উন্নয়ন ব্যয় একই অনুপাতে কমবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সরকারের মোট আয়, বাজেটের অগ্রাধিকার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার কৌশলও এখানে বিবেচ্য।
বিদেশি ঋণে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন
বিদেশি ঋণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল না এলে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে ঋণের অর্থনৈতিক বোঝা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো বিনিময় হার। বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান কমে গেলে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে সরকারের বেশি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে বৈদেশিক ঋণের প্রকৃত ব্যয় শুধু সুদের হারের ওপর নির্ভর করে না; বিনিময় হার ও পরিশোধের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে নতুন ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পের সম্ভাব্য আয়, অর্থনৈতিক সুফল, বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা মূল্যায়ন করা জরুরি।
ঋণ কমাতে সরকারের পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, সরকারের নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কর ও করবহির্ভূত আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ঋণের সুদ ব্যয় ও পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি কমাতে সুশৃঙ্খল ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাজারভিত্তিক অর্থায়ন এবং বার্ষিক ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় সাধারণত কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পায়—কর আদায়ের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো, সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণ, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যয় পর্যালোচনা এবং ঋণের অর্থের ব্যবহার নিয়মিত নিরীক্ষা করা। এসব পদক্ষেপ কার্যকর হলে নতুন ঋণের প্রয়োজন কমানো এবং বিদ্যমান ঋণের বোঝা সামলানো সহজ হতে পারে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ঋণের পরিমাণ কমানো নয়; বরং ঋণকে এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করা, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত না হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি না হয়।
ঋণ নিয়ে উৎপাদনশীল অবকাঠামো গড়ে উঠলে তা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান, আয় ও রাজস্ব বাড়াতে পারে। বিপরীতে, প্রকল্পে অপচয়, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা প্রত্যাশিত সুফল না এলে ঋণ পরিশোধের দায় থেকে যায়, কিন্তু অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব সীমিত হতে পারে।
তাই সরকারি ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধেও গুরুত্ব দেওয়া।
