নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা : মহাসড়কে কাস্টমস কর্মকর্তাকে কুপিয়ে হত্যা, এক টুকরো আইফোনের লোভে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে পাহাড়ে নিয়ে খুন কিংবা বৃদ্ধাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ডোবায় ফেলা—গত কয়েক মাসে একের পর এক লোমহর্ষক অপরাধে কেঁপে উঠেছে পুরো কুমিল্লা জেলা। চুরি-ছিনতাই তো নিত্যদিনের ঘটনা, তবে খুন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের গ্রাফ এখন অতীতের সব হিসাব ছাড়িয়ে গেছে।
জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সালের পুরো বছরে কুমিল্লায় ১০৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। অথচ চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১১টিতে। একই সময়ে জেলায় ১৩৯টি ধর্ষণ, ২৩২টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ১৪টি অপহরণ এবং ৩৬টি দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। জেলার ১৮টি থানায় নয় মাসে বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে চার হাজার ৯৬৩টি। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫৫০টি করে গুরুতর অপরাধের মামলা জমা পড়েছে থানাগুলোতে।
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, গত মে মাসে কুমিল্লায় সর্বোচ্চ ১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। এরপর সেপ্টেম্বরে ঘটে ১৬টি হত্যাকাণ্ড। জুনে সর্বোচ্চ ৪১টি নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের হয়। অপরাধের এই উল্লম্ফনে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর নৃশংসতা। ২৫ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে ফিরে মহাসড়কের ঝাগুরঝুলি এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। ৭ আগস্ট রাতে দেবিদ্বারে ফরিদা ইয়াসমিন নামের এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ টুকরো টুকরো করে পলিথিনে মুড়িয়ে ডোবায় ফেলে দেয় ভাড়াটিয়া চক্র।
সবচেয়ে বড় নাড়া দিয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের হিংস্রতা। গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের একমাত্র ছেলে ও সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিমকে তার আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে হত্যা করে কিশোর অপরাধীরা। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ৪ অক্টোবর রেসকোর্স এলাকার আরেক সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ধানক্ষেতে ফেলে দেয় এক অটোরিকশাচালক।
সমাজ বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এই অবক্ষয় ঠেকানো অসম্ভব। পরিবার পর্যায়ে নজরদারির অভাব, শিশু-কিশোরদের লাগামহীন মোবাইল আসক্তি এবং কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার এই পরিস্থিতিকে উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতাও অপরাধীদের ভয়হীন করে তুলছে। নারী-শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও চিকিৎসকরা বলছেন, ডাক্তারি পরীক্ষার আলামত নষ্ট হওয়া, ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে বহু অপরাধী ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়।
তবে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে দাবি পুলিশের। জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য, প্রতিটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুততম সময়ে উন্মোচন করা হয়েছে এবং আসামিদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী ধারাবাহিক অভিযানে ইতিমধ্যে দুই সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
