নিজস্ব প্রতিবেদক: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনুমোদন পাওয়া দুটি নতুন বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল “নেক্সট টিভি” ও “লাইভ টিভি”র মালিকানা ও অর্থের উৎস নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির নামে কোটি কোটি টাকার লাইসেন্স ইস্যু করা হলেও, অনুসন্ধানে এই বিপুল অর্থায়নের পেছনে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও রহস্যময় ‘ব্যবসায়িক অংশীদারদের’ নাম বেরিয়ে এসেছে।
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ক্ষমতার জোর খাটিয়ে চ্যানেল দুটির অনুমোদন দেওয়া হয়। লাইসেন্স পাওয়া দুই ব্যক্তিরই নাম আরিফুর রহমান, যাদের দুজনেরই টেলিভিশন চ্যানেল পরিচালনার মতো নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে খোদ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মাঝে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
কাগজে এনসিপির নাম, পেছনে বিএনপির অর্থায়ন
প্রাপ্ত নথি ও অনুসন্ধান অনুযায়ী, “নেক্সট টিভি”র লাইসেন্স আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মো. আরিফুর রহমান তুহিনের নামে এলেও এর চালিকাশক্তি দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির সদস্য আকরাম হোসাইন। ১৯৯৭ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণ নেতার নামে প্রতিষ্ঠানটিতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার শেয়ার রয়েছে। এছাড়া এনসিপি নেতা আতাউল্লাহ, সাইফুল্লাহ হায়দার এবং বিতর্কিত নেতা জয়নাল আবেদীন শিশিরের নামেও রয়েছে হাজার হাজার শেয়ার।
এনসিপি নেতাদের নামে এই বিপুল পরিমাণ শেয়ারের মূলধনের উৎস খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, চ্যানেলটির পরিচালনা পরিষদে রয়েছেন বগুড়া জেলা বিএনপির প্রাক্তন সংসদ সদস্য একেএম হাফিজুর রহমানের ছেলে একেএম গোলাম হাসনাইন। তিনি সৌদি আরব প্রবাসী বিএনপি (পূর্বাঞ্চল) শাখার সভাপতি। গোলাম হাসনাইন নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে তিনি ‘৩৬ মিডিয়া লিমিটেড’ (নেক্সট টিভি)-এর অন্যতম পরিচালক এবং তিনিই এই চ্যানেলে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। ফলে এনসিপি-ঘনিষ্ঠ এই চ্যানেলে বিএনপির বড় নেতার অর্থ ঢালার বিষয়টি পুরো রাজনৈতিক সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে, “লাইভ টিভি”র লাইসেন্সধারী জাতীয় নাগরিক কমিটির সাবেক সদস্য আরিফুর রহমান পড়াশোনা শেষ করেছেন মাত্র ছয় বছর আগে। তিনি নিজে স্বীকার করেছেন যে তাঁর ‘ব্যবসায়িক সহযোগীরা’ এই উদ্যোগে অর্থ যোগাচ্ছেন, তবে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা সেই রহস্যময় সহযোগীদের পরিচয় তিনি প্রকাশ করেননি।
যেভাবে মিলল লাইসেন্স: নাহিদ-সচিবের ‘চাপ’
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ও গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, গেন্ডারিয়ার ঠিকানায় আবেদন করা “নেক্সট টিভি” এত বড় বাজেটের বিপরীতে কোনো বৈধ ও সঠিক আর্থিক উৎস দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। তা সত্ত্বেও সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের বিশেষ আগ্রহ এবং তৎকালীন তথ্য সচিবের তীব্র প্রশাসনিক চাপের মুখে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হয়। রাজনৈতিক আনুগত্য ও প্রভাব খাটিয়ে গণমাধ্যমের লাইসেন্স নেওয়ার এই ঘটনাকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘মিডিয়া দখলবাজি ও স্বজনপ্রীতি’র অবিকল পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের তোপ ও সুধীসমাজের প্রতিক্রিয়া
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত মিডিয়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও স্বীকার করা হয়েছে যে, বেসরকারি খাতে টেলিভিশন লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক আনুগত্য, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিতে কলুষিত। বাজারে বিজ্ঞাপনের তীব্র সংকট এবং বিদ্যমান চ্যানেলগুলো যেখানে কর্মী ছাঁটাই ও বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়াই নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা।
এ বিষয়ে মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রত্যাশা ছিল সব সিদ্ধান্ত নিয়মনীতির মধ্যে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পুরোনো ধারাই অনুসরণ করা হচ্ছে। কোনো নীতিমালা ছাড়া কীভাবে একের পর এক চ্যানেল অনুমোদন পাচ্ছে?”
সব মিলিয়ে, নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণ করতে না পারা এনসিপি নেতাদের নামে কোটি কোটি টাকার এই মূলধন কোথা থেকে এলো, এর পেছনে আর কোনো গোপন চুক্তি রয়েছে কি না— তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও ধিক্কারের সৃষ্টি হয়েছে।
