ফোরটিন ডেস্ক : নিত্যপণ্যের বাজারে টিকে থাকতে ন্যূনতম মজুরির ন্যায্য দাবিতে রাজপথে নামা পোশাকশ্রমিকেরা যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের হামলায় মার খাচ্ছেন ও প্রাণ হারাচ্ছেন, ঠিক সেই সময়েই রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির জিগাতলায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের মেগা প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের লাখ লাখ শ্রমিকের পেটের ভাত ও মজুরি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে সরকারি কর্মচারীদের জন্য শতকোটি টাকার এই ব্যয় বরাদ্দকে চরম সামাজিক বৈষম্য ও অগ্রাধিকারহীন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য উন্নত ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এই প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মোট ১৩টি প্রকল্পের অনুমোদন মেলে, যার সামগ্রিক বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ধানমন্ডির জিগাতলা সরকারি কলোনির ২ দশমিক ৪৪ একর জমিতে ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর পুরোনো ভবন ভেঙে ১৩ তলাবিশিষ্ট তিনটি নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে শতভাগ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে ১০ম থেকে ১২তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৮৫০ বর্গফুট আয়তনের মোট ১৮৪টি ফ্ল্যাট থাকবে।
তবে রাজপথে যখন শ্রমিকদের রক্তের দাগ শুকায়নি এবং অতীতে নির্মিত সরকারি আবাসনগুলোই অব্যবহৃত পড়ে থাকার নজির রয়েছে, তখন নতুন করে এমন প্রকল্প গ্রহণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশন ও শিয়ালবাড়ি ছাড়াও নোয়াখালী ও নারায়ণগঞ্জে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অর্ধশতাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল।
বিদ্যমান ফ্ল্যাটগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না করে নতুন মেগা প্রকল্প নেওয়ার সমালোচনা করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, “সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসংকট থাকতেই পারে। তবে নির্মিত ভবনগুলো কেন ব্যবহার হচ্ছে না কিংবা যথাযথভাবে কেন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না, আগে সেই কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। বিপুল অর্থ ব্যয়ে ভবন নির্মাণের পর সেগুলো যদি খালি পড়ে থাকে, তবে সেই ব্যর্থতা সমাধান না করে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া যৌক্তিক হতে পারে না।”
এদিকে একনেক সভায় অনুমোদিত ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকার মধ্যে ৫০ হাজার ৪১ কোটি টাকাই জোগান দেওয়া হচ্ছে সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে। সাধারণ করদাতাদের অর্থে পরিচালিত সরকারের এমন সময়ে মেহনতি পোশাকশ্রমিকদের পেটে লাথি মেরে আমলা ও কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর এই মহোৎসবকে নীতিনির্ধারকদের চরম অবিবেচনাপ্রসূত অগ্রাধিকার হিসেবেই চিহ্নিত করছে সচেতন মহল।
