ফোরটিন ডেস্ক : ‘বাপে মারছে সৈনিক, মায়ে মারছে কৃষক, পোলায় মারছে শ্রমিক’ বুকের ভেতর জমাট বাঁধা তীব্র ক্ষোভ আর বঞ্চনা থেকে উঠে আসা এমন ঝাঁজালো স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের প্রধান সব শিল্পাঞ্চল। নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আর কেবল কারখানার গেটে সীমাবদ্ধ নেই; দফায় দফায় সড়ক অবরোধ, পুলিশের টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং হামলার মুখে তা এখন রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে। এর মধ্যেই গাজীপুরে সংঘর্ষের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করার সময় হামলার শিকার পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যু আন্দোলনরত শ্রমিকদের ক্ষোভের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে।
লায়লা স্টাইল লিমিটেডের কর্মী তৌফিক হোসেন সোমবার নোমান টেরি টাওয়েল মিলসের সামনে গুরুতর আহত হওয়ার পর উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এক সহকর্মীর এমন নির্মম মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বুধবার সকাল থেকেই গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের রাজপথ নতুন করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুরের সাইনবোর্ড, বাংলাবাজার ও মির্জাপুর এলাকায় কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল পুরোপুরি অচল করে দেন। পুলিশ বাধা দিতে গেলে শুরু হয় ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে উপর্যুপরি টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে পুলিশ। একই সময়ে বোর্ডবাজার ও বড়বাড়ী এলাকাতেও মহাসড়ক অবরোধ করেন ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরো গাজীপুরে নামানো হয়েছে ১৩ প্লাটুন বিজিবি।
অন্যদিকে সাভারের হেমায়েতপুরেও সকাল থেকে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান শ্রমিকেরা, যেখানে আগের দিন টানা পৌনে ছয় ঘণ্টা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরুদ্ধ ছিল। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় কুতুবাইল কাঠেরপুল এলাকায় শ্রমিকরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের তাড়িয়ে দেয়; এ সময় স্থানীয় একটি কারখানার নারী শ্রমিক গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শ্রমিকদের ওপর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলার অভিযোগও ওঠে। রাজধানীর মিরপুরে আগের দিনের ব্যাপক সংঘর্ষ ও পুলিশ আহতের ঘটনার পর বুধবার মিরপুরজুড়ে ১০ সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে কড়া পাহারা বসানো হয়।
বিজিএমইএ-র তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের কারণে শুধু মঙ্গলবারই ৩০৬টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ, যাতে প্রায় সাত লাখ শ্রমিকের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। শিল্পাঞ্চলগুলোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাভার-আশুলিয়ায় ৫ প্লাটুন, গাজীপুরে ১৩ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জে ৬ প্লাটুনসহ মোট ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে সরকারের গঠিত ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড বুধবার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসলেও রাজপথের বাস্তবতায় তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। শ্রমিকনেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট আর্থিক ঘোষণা ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া কেবল কালক্ষেপণের টেবিলে বসে এই জনরোষ সামাল দেওয়া যাবে না; কারণ পেটের ক্ষুধা আর স্বজন হারানোর বেদনা রাজপথের শ্রমিকদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
