ফোরটিন ডেস্ক : বিশ্বখ্যাত বড় বড় ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল পোশাক যাদের ঘামে তৈরি হয়, সেই কারিগরদের পেটের ভাতের লড়াই আর হাহাকার এবার বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছে। বর্তমান আকাশছোঁয়া বাজারে মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকার মজুরিতে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকার দাবিতে রাজপথে নেমেছেন দেশের পোশাকশ্রমিকেরা। সংকট মেটাতে সরকারের তরফ থেকে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও রাজপথের ক্ষোভ থামেনি; বরং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহারের ঘটনার পর দ্বিতীয় দফায় দেশের অন্তত ৬৭৯টি কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই চরম শিল্প সংকটের চিত্র বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বসন্ত ও গ্রীষ্মকালীন রপ্তানি মৌসুমের ঠিক আগমুহূর্তে নতুন করে তৈরি হওয়া এই অসন্তোষ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিতে পারে।
ঢাকা, আশুলিয়া ও গাজীপুরের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে টানা অবরোধ ও বিক্ষোভের মুখে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রয়টার্স জানায়, বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং অন্তত ২০ থেকে ২৫টি কারখানায় ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে।
শ্রমিকদের এই অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার। তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পান বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকেরা। কারখানা মালিকরা যদি শ্রমিকদের পেটে ভাত দেওয়ার মতো বেতন দিতে না পারেন, তবে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে পণ্যের দাম বাড়ানো উচিত। স্বল্প বেতনের শ্রমিকদের পিঠে চড়ে কোনো ব্যবসা বেশি দিন চলতে পারে না।
অন্যদিকে কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলো নিজেরাই বড় আর্থিক চাপে রয়েছে। বারবার কারখানা বন্ধ ও ভাঙচুর চলতে থাকলে মালিকপক্ষ বাধ্য হয়ে ‘কাজ নেই, বেতন নেই’ নীতিতে যেতে বাধ্য হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমেদও সতর্ক করে বলেছেন, আন্দোলনের আড়ালে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান পুরো বিষয়টি একটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি ও বাজারে সব পণ্যের চড়া দামের কারণে শ্রমিকদের ক্ষোভ অত্যন্ত বাস্তব ও বোধগম্য। কিন্তু হুট করে একলাফে বেতন দ্বিগুণের বেশি বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ঝুঁকিতে পড়বে। এর টেকসই সমাধান হিসেবে ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয়, কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে পোশাকের ন্যায্য দাম আদায়ের ওপর জোর দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।
