নিজস্ব প্রতিবেদক, টাঙ্গাইল : এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে চারদিকে যখন বাঁধভাঙা আনন্দ আর মিষ্টি বিতরণের উৎসব, তখন টাঙ্গাইলের গোপালপুরের একটি বাড়িতে চলছে শোকের মাতম আর কুলখানির আয়োজন। হত্যার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবিত থাকার নাটক সাজিয়ে যে কলেজছাত্রের পরিবারের কাছ থেকে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছিল, সেই মেধাবী শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। ছেলের অনন্য এই অর্জনে মিষ্টি বিলানোর বদলে বাড়িতে আয়োজন করা হয়েছে দোয়ার মাহফিল, খাওয়ানো হয়েছে এতিম শিশুদের।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদির আটা গ্রামের খাদেমুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলাম ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। ফল প্রকাশের পর দেখা যায় তিনি সর্বোচ্চ সাফল্য জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তবে এই আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ আর রাকিবের ভাগ্যে জোটেনি।
রাকিবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। যে পড়ার টেবিলে বসে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতেন তিনি, সেখানে এখনো থরে থরে সাজানো রয়েছে তাঁর বই-খাতা। পাশে রাখা রাকিবের একটি বাঁধাই করা ছবি। শিক্ষাজীবনে অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া ক্রেস্ট আর সম্মাননাগুলোও স্বজনেরা পরম যত্নে সাজিয়ে রেখেছেন। ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখায় দারুণ মনোযোগী রাকিব স্কুলজীবনে ছয়টি সরকারি ও বেসরকারি বৃত্তি পেয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে ব্যারিস্টার হওয়া এবং বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করাই ছিল তাঁর আজন্ম স্বপ্ন। পরীক্ষার পর সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করতে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় রাকিবকে নির্মমভাবে হত্যার অভিযোগে আব্দুল্লাহ মামুন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাকিবকে হত্যার পর ঘাতক চক্র এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁর জীবিত থাকার একটি কৃত্রিম ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠায়। ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় ধারদেনা করে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয় তাঁর পরিবার। কিন্তু অর্থ নেওয়ার পরও জীবিত ফেরত পাওয়া যায়নি রাকিবকে; পরবর্তীতে নীলফামারীর ডিমলা এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ফল প্রকাশের পর কান্নায় ভেঙে পড়ে রাকিবের মা জোহরা বেগম বলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছিলেন। আশা ছিল ছেলে বড় হয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করবে, কিন্তু ঘাতকেরা সব আশা শেষ করে দিয়েছে। বাবা খাদেমুল ইসলাম এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা জানান, মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখতে না পেয়ে তাঁরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। মেধার চূড়ান্ত স্বীকৃতি পাওয়া দিনে তাঁরা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।
