নিজস্ব প্রতিবেদক, কেরানীগঞ্জ: ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে চাঁদাবাজি, জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন কয়েকজন ব্যক্তি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবারও এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিন এবং সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন বর্তমানে বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, বিএনপির স্থানীয় নেত্রী ও সংসদ সদস্য নিপুণ রায়ের নাম ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেও কেউ কেউ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন।
যুবলীগ থেকে যুবদলে নেতৃত্বে আসার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকার বাসিন্দা ইমতিয়াজ আহমেদ শাকিল। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি শুভাঢ্যা ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে শুভাঢ্যা ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান।
এরপর পুরোনো সহযোগীদের নিয়ে তিনি এলাকায় একটি প্রভাবশালী গ্রুপ গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। হালিম, ইকবাল, কাওসার, সোহেল ও আমিরসহ কয়েকজনকে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা।
সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগে আব্দুল আজিজের নামও উঠে এসেছে। তিনি শুভাঢ্যা পূর্বপাড়া, মদিনা নগর এলাকার বাসিন্দা। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন।
এ ছাড়া একই এলাকার জয় আহমেদ সজিবকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা যুবলীগের সাবেক সদস্য এবং মো. বাবুল হোসেনকে শুভাঢ্যা ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের একাংশ। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চাঁদা না দিলে মামলা ও ভয়ভীতির অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এলাকায় চাঁদাবাজি ও জমি দখলের চেষ্টা করছে। কেউ কথিত দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো, মারধর, অপহরণ কিংবা হত্যার হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
তাদের ভাষ্য, এসব কারণে ব্যবসায়ী, জমির মালিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মামলা, সাধারণ ডায়েরি, পুলিশি নথি কিংবা আদালতের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কয়েকজন ভুক্তভোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রত্যাশিত ব্যবস্থা পাওয়া যাচ্ছে না।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাব কাজ করছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
এদিকে বিএনপির স্থানীয় নেত্রী ও সংসদ সদস্য নিপুণ রায়ের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়দের একটি অংশ। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে নিপুণ রায় কিংবা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে চাঁদাবাজি, জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই নয়, তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
