ফোরটিন ডেস্ক : জেনেভায় এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি, শিক্ষার্থীদের অধিকার, বিচারব্যবস্থা, কারাগারে আটক ব্যক্তিদের অবস্থা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ ও অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতেই শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ‘সাংবিধানিক ক্রসরোডে’ দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর ভাষায়, সংবিধান শুধু একটি দলিল নয়, এটি নাগরিককে নির্বিচার ক্ষমতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া, আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধানের নিশ্চয়তা দেয়।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের মানুষের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনেনি। তাঁর দাবি, মুহাম্মদ ইউনূস সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন এবং এর প্রভাব এখনো দেশের মানুষ ভোগ করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনার অভিযোগ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।
গাজীপুরের একটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক নারী তার সন্তানদের সামনে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। কুষ্টিয়ায় স্থানীয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে হামলা ও সম্পত্তি নিয়ে আদালতে যাওয়া এক ৬৫ বছর বয়সী নারীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তারের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।
এ ছাড়া ময়মনসিংহে ছাত্রলীগ নেতা বশিরের ওপর হামলা, চট্টগ্রামে হাসপাতালে নবজাতক সন্তানকে দেখতে যাওয়া ছাত্রলীগ নেতা হাসানের গ্রেপ্তার, ময়মনসিংহে এক স্বর্ণকারের মরদেহ উদ্ধার, বাগেরহাটে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার এবং গোপালগঞ্জে এক কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর মতো কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
কারাগারে চিকিৎসার অভাবে কিশোরগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতা কাইয়ুম আমিন রুহুলের মৃত্যুর অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা বলেন, গণমাধ্যমে যেসব ঘটনা পৌঁছায়, সেগুলো মোট পরিস্থিতির একটি অংশমাত্র। তাঁর দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী, খাল, জলাভূমি ও সড়কের পাশ থেকে মরদেহ উদ্ধার, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও অবৈধ দখলের মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
তাঁর মতে, পরিস্থিতি এখন শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আইন, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন শেখ হাসিনার
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, কিছু শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষার্থী পরিচয় হারিয়েছেন, সার্টিফিকেট বাতিল হয়েছে এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, কোনো শিক্ষার্থী অপরাধ করলে সেই ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে দায় নির্ধারণ করা উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো তরুণের শিক্ষা, যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করা ন্যায়বিচার বা গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা, বিতর্ক ও স্বাধীন চিন্তার জায়গা হিসেবে রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিচারব্যবস্থা ও কারাগার নিয়ে শেখ হাসিনার অভিযোগ
দেশের কারাগার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনার দাবি, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা, কর্মী ও সমর্থক আটক, মামলার মুখোমুখি অথবা আত্মগোপনে রয়েছেন।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, সমান আচরণ এবং বিচারব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, কোনো নাগরিকের আইনি সুরক্ষা যদি তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক।
বিচারিক কার্যক্রমের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাইব্যুনালকে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা বা রাজনৈতিক জীবন থেকে বাদ দেওয়া।
একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া, আসামিপক্ষের অধিকার এবং বিচারিক কার্যক্রমের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত ও স্বাধীন হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে বক্তব্য
বক্তব্যের বড় একটি অংশজুড়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তিনি আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, দলটির স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে এবং দলটির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনা দাবি করেন, এর ফলে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে চলে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তি এবং সেই দলের সমর্থকদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে কোনো নির্বাচনকে পুরোপুরি প্রতিনিধিত্বশীল বলা কঠিন।
শেখ হাসিনার বক্তব্য, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে। ভয়, শক্তি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়, জনগণের স্বাধীন ও সচেতন মতামতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নির্ধারিত হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি শেখ হাসিনার আহ্বান
জেনেভা থেকে জাতিসংঘ, গণতান্ত্রিক সরকার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।
তিনি নির্বিচার আটক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বন্ধ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং বিশ্বাসযোগ্য আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানান।
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত না করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এ ছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনার মতে, বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে দেশের জনগণ নিজেরাই নির্ধারণ করবে কে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
১৯৭৫-এর স্মৃতি তুলে প্রতিশোধের রাজনীতির বিরোধিতা
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ওই ঘটনায় তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মা, তিন ভাই, দুই ভাবিসহ পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়েছেন।
এরপর বছরের পর বছর নির্বাসিত জীবন কাটানো, কারাবরণ এবং নিজের ওপর একাধিক হামলার চেষ্টার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে শিখিয়েছে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের ওপর গড়ে তোলা যায় না।
নিজের বাবার স্বপ্নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করবে, আইন দুর্বল ও শক্তিশালী উভয়কেই সুরক্ষা দেবে এবং রাষ্ট্র জনগণের হবে।
কেমন বাংলাদেশ চান শেখ হাসিনা
বক্তৃতার শেষ অংশে শেখ হাসিনা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরেন।
তিনি এমন বাংলাদেশের কথা বলেন, যেখানে একজন প্রবীণ নারী গ্রেপ্তারের ভয় ছাড়াই আদালতে যেতে পারবেন, বিপদের মুখে একজন মা রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাবেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো শিক্ষার্থী তার ভবিষ্যৎ হারাবে না এবং কারাগারে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি যথাযথ চিকিৎসা পাবেন।
রাজনৈতিক মত বা বিশ্বাস যা-ই হোক, প্রত্যেক নাগরিককে আইনের সমান সুরক্ষা দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনার ভাষায়, এটিই সংবিধানের প্রতিশ্রুত বাংলাদেশ। জনগণের সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেই বাংলাদেশই পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন।
জেনেভার বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূলত বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়ানো, আইনের শাসন ও বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সব রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
