ফোরটিন ডেস্ক : পলায়ন, নাশকতা সৃষ্টি, কর্মস্থলে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের ৬৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রক্রিয়া চলছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন জেলার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি), ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তাও রয়েছেন।
এরই মধ্যে ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির ঘটনায় করা বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকার ও প্রশাসন বিশ্লেষক এবং সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা জরুরি। তিনি মনে করেন, অপরাধী কর্মকর্তাদের শাস্তি হওয়া উচিত, তবে বিচার করতে গিয়ে যেন কারও প্রতি অবিচার না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
পলাতক ৩৩ কর্মকর্তা
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে পলাতক রয়েছেন এমন ৩৩ কর্মকর্তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও গত দুই বছরে পলাতক থাকার অভিযোগে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পলাতক কর্মকর্তাদের মধ্যে রংপুরের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এবং পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত মো. শাহ নূর আলম পাটওয়ারী রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায়ও ঘোষণা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক এসপি মো. আলী আশরাফ ভূঞা, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার জেসমিন কেকা, সাবেক পুলিশ সুপার আয়েশা সিদ্দিকা এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি নূরে আলম মিনাসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা পলাতক রয়েছেন।
বগুড়ার সাবেক এসপি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ইতোমধ্যে বরখাস্ত হয়েছেন। ডিএমপির সাবেক ডিআইজি কাজী মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার অভিযোগে এ কে এম এহসানউল্লাহর বিরুদ্ধেও চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া চলছে।
পলাতক কর্মকর্তাদের তালিকায় আরও রয়েছেন ডিআইজি বিপ্লব বিজয় তালুকদার, অতিরিক্ত ডিআইজি টুটুল চক্রবর্তী, অ্যাডিশনাল ডিআইজি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, ডিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, পুলিশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন।
দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ
প্রথম দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়ায় পলাতক নয় কর্মকর্তাকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তালিকায় রয়েছেন সাবেক আরপিএমপি-রংপুরের রুবাইয়াত জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখারুল ইসলাম, ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রওশানুল হক সৈকত, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এস এম শামীম, ডিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার মফিজুর রহমান পলাশ, সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইমরুল এবং সহকারী পুলিশ সুপার নাহিদ ফেরদৌস।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব কর্মকর্তার কেউ বর্তমানে দেশে নেই। ফলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়া চালিয়ে চাকরিতে না রাখার সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে সরকার।
নাশকতার অভিযোগে তিন কর্মকর্তা
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা চলছে।
তাদের মধ্যে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর খুলনা রেঞ্জে সংযুক্ত মুহাম্মদ মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে। ময়মনসিংহ রেঞ্জে সংযুক্ত মো. ফখরুল আলমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত সৈয়দ ইফতেহার আলীর বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগে বিভাগীয় মামলার পুনঃতদন্ত চলছে।
অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ
কর্মস্থলে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে। তাদের মধ্যে সাময়িক বরখাস্তকৃত এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত এস এম ফজলুল হকের মামলাও রয়েছে।
রংপুরের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শিবলী কায়সারের বিরুদ্ধে অসদাচরণের তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়েছে। তাকে বরখাস্তের বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশনের মতামত চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কক্সবাজারের সাবেক এসপি মুহাম্মদ রহমত উল্লাহর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলার তদন্ত চলছে। ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের নামও এই তালিকায় রয়েছে।
আরও ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা
পলায়ন, নাশকতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতির বাইরে অন্যান্য অভিযোগেও ১৩ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কর্মকর্তার বেশির ভাগের চাকরিতে থাকার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। তবে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে, তাদের ক্ষেত্রে বিভাগীয় কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনালের রায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পিএসসি ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে ১৫ সার-সংক্ষেপ
সরকারি চাকরি থেকে কোনো কর্মকর্তাকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মতামত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এজন্য কয়েকজন কর্মকর্তার নথি পিএসসিতে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া কয়েকজন কর্মকর্তার বরখাস্তের অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।
সাবেক এসপিসহ ছয়জন ইতোমধ্যে বরখাস্ত
এরই মধ্যে চাকরি থেকে পলায়ন এবং অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া অন্য কর্মকর্তারা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ রঞ্জন দে, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাজীব দাস এবং সাবেক পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।
