নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রাক্তন অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য খাতে নজিরবিহীন বিপর্যয়: হামে ১,১৯৬ শিশুর মর্মান্তিক মৃ’ত্যু, আক্রান্ত ২ লক্ষাধিক!
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে চরম অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক হঠকারিতা ও রাজনৈতিক উদাসীনতার মারাত্মক মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশের অবুঝ শিশুদের। সদ্য বিদায়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভুল নীতি, স্বজনপ্রীতি ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে সারা দেশে হামের ভয়াবহ মহামারি প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সরকারি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এক লোমহর্ষক চিত্র—স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে এই ঘাতক রোগে ও রোগের উপসর্গ নিয়ে ইতোমধ্যে ১,১৯৬ জন শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে।
একদিন যে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) রোল মডেল হিসেবে প্রশংসিত হতো, গত ১৮ মাসে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের খামখেয়ালিপনায় সেই সুরক্ষিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ আপডেট (১৮ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পরিসংখ্যান):
মোট করুণ মৃত্যু: ১,১৯৬ জন (যার মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০৪ জন এবং হামের ভয়াল উপসর্গ নিয়ে ১,০৯২ জন শিশু মারা গেছে)।
গত ২৪ ঘণ্টার ট্র্যাজেডি: গত ২৪ ঘণ্টাতেই হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৭ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং ১,৩১৯ জন মারাত্মক আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
মোট আক্রান্তের সংখ্যা: গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২,১৩,২৪৪ জনে (যার মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত ২৩,১২২ জন)।
সংকটের মূলে ‘অপারেশন প্ল্যান’ বাতিল ও ইউনূস প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৯৮ সাল থেকে অত্যন্ত সফলতার সাথে চলে আসা স্বাস্থ্য খাতের ‘অপারেশন প্ল্যান’ (ওপি) নামক পরীক্ষিত ও বিশ্বস্বীকৃত পদ্ধতিটি ২০২৫ সালের মার্চে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘এক্সিট প্ল্যান’ ছাড়াই হুট করে বাতিল করে দেয় ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলে জীবনরক্ষাকারী টিকা কেনা, অভিজ্ঞ জনবল ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন অর্থায়ন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।
বিশিষ্ট স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ একে অন্তর্বর্তী সরকারের চরম ‘খামখেয়ালি’ সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করে বলেন:
“দুর্নীতি বন্ধের নামে পুরো পরীক্ষিত সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়া ছিল মহাভুল। সিস্টেম সচল রেখে সমাধান খোঁজা যেত, কিন্তু পুরো কাঠামোটাই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।”
ইউনিসেফের আকুতি তোয়াক্কা না করে টিকা সংগ্রহে নজিরবিহীন দীর্ঘসূত্রতা,
আগে ইউনিসেফের (UNICEF) মাধ্যমে সরাসরি গুণমানসম্পন্ন টিকা কেনা হলেও ইউনূস সরকার নিজেদের মনগড়া নিয়মে উন্মুক্ত দরপত্রের জটিলতায় পা বাড়ায়। সেই সময়ে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে সরাসরি অনুরোধ করে বলেছিলেন, “দোহাই লাগে, এটা করবেন না!” কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক সংস্থার সেই আকুল আবেদন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন।
এর চূড়ান্ত মাশুল হিসেবে টিকা সংগ্রহে মাসের পর মাস নজিরবিহীন বিলম্ব ঘটে এবং ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে হামসহ ছয়টি জীবনরক্ষাকারী টিকার সরকারি মজুত একেবারে শূন্যে গিয়ে ঠেকে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী দেশে সর্বদাই অন্তত তিন মাসের অতিরিক্ত রিজার্ভ বা মজুত থাকার কথা ছিল।
ভেঙে পড়া টিকাদান ব্যবস্থা ও ভুয়া কাগজ-কলমের হিসাব।
যেখানে ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হামের টিকার কভারেজ ছিল ১০০ শতাংশেরও বেশি, ইউনূস প্রশাসনের ২০২৫ সালে তা মারাত্মকভাবে কমে ৯২ শতাংশে নেমে আসে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত কভারেজ ছিল আরও আশঙ্কাজনকভাবে কম। কারণ আন্দোলন ও বেতন-ভাতা না পাওয়ার অসন্তোষে স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক স্থানে টিকা না দিয়েই কেবল কাগজ-কলমে ভুয়া হিসাব দেখিয়েছেন। ফলে শিশুদের শরীরে অর্জিত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত সুরক্ষা প্রাচীর পুরোপুরি ধসে পড়ে।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা স্বীকার করে অজুহাত দিয়েছেন যে, তারা ‘জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায়’ অন্যদিকে নজর দিতে পারেননি! কিন্তু রুটিন টিকাদানের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যুতে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন অজুহাতকে চরম অপরাধমূলক অবহেলা হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবায় চরম ধস ও বর্তমান অচল অবস্থা।
শুধু হামই নয়, ওপি বাতিলের অদূরদর্শী প্রভাবে দেশের ১৪ হাজারের বেশি ট্রাস্টিভুক্ত কমিউনিটি ক্লিনিকে জরুরি ওষুধের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বিকল হয়ে পড়ে আছে। শিশুদের অপুষ্টি প্রতিরোধে অতি জরুরি ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন ও কৃমিনাশক ট্যাবলেট বিতরণের মতো কার্যক্রম টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে কয়েকটি তড়িঘড়ি টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিলেও পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া এই ধ্বংসস্তূপের কারণে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। অবুঝ শিশুদের এই মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়—এটি ইউনূস সরকারের দূরদর্শিতাহীনতা ও ব্যর্থতার এক করুণ দলিল।
Comments
