ফোরটিন ডেস্ক : স্টেথোস্কোপের মতো ছোট একটি যন্ত্র হাতে নিয়ে রোগীর শরীরে আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা, আর সেই পরীক্ষার ছবি বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা। চিকিৎসাপ্রযুক্তির এই ধারণাকে বাস্তবে এগিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সো। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ড. ইউসুফ হক। সেমিকন্ডাক্টর, চিকিৎসা-ইমেজিং ও ক্ষুদ্রাকৃতির ইলেকট্রনিক চিপ তৈরিতে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এক্সোর লক্ষ্য, বহনযোগ্য আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির মাধ্যমে হাসপাতালের বাইরে, এমনকি প্রত্যন্ত এলাকাতেও রোগ নির্ণয়ের কিছু সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এক্সোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ হক ও সন্দীপ আকারাজু। বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময় ইউসুফ হক জানান, প্রথম পর্যায়ে দেশের বড় হাসপাতালগুলোতে যন্ত্রটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে গ্রামীণ ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও এটি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য তাঁদের। তবে এই ঘোষণা পরিকল্পনার কথা জানায়, বাংলাদেশে যন্ত্রটির ব্যাপক ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, এমনটি নিশ্চিত করে না।
এক্সোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, ইউসুফ হক প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা এবং প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে তাঁর কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫টি পেটেন্টের সহ-স্বত্বাধিকারী এবং কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা ও পণ্য উন্নয়নেও কাজ করেছেন তিনি।
এক্সো প্রতিষ্ঠার আগে ইউসুফ হক স্লাইসএক্স বা ক্রেস্ট সেমিকন্ডাক্টরসের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠানটি দাঁতের ডিজিটাল এক্স-রে ইমেজিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করত। এরও আগে দুই দশকের বেশি সময় তিনি ম্যাক্সিম ইন্টিগ্রেটেড প্রোডাক্টসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন। ওই সময়ে তাঁর কাজের মধ্যে ছিল ডিজিটাল এক্স-রে ইমেজিংয়ের চিপসেট, রক্তে গ্লুকোজ পরিমাপের যন্ত্রে ব্যবহৃত চিপ, চিকিৎসা-আল্ট্রাসাউন্ডের ইলেকট্রনিক উপাদান এবং গাড়ির স্বয়ংক্রিয় পার্কিং ব্যবস্থায় ব্যবহৃত অতিসংবেদী অতিস্বনক প্রযুক্তি। এক্সোর প্রোফাইল অনুযায়ী, বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া ৩০টিরও বেশি সমন্বিত সার্কিট পণ্য নকশায় তাঁর ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি তিনি দুই দশক ধরে আইইইইর বিভিন্ন কারিগরি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০১৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড সিটিতে ইউসুফ হক, সন্দীপ আকারাজু, জানুস ব্রাইজেক ও জন কোকুলিস মিলে এক্সো ইমেজিং প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসা-ইমেজিং প্রযুক্তিকে আরও সহজে বহনযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দেয়। তাদের তৈরি এক্সো আইরিস একটি হাতে বহনযোগ্য আল্ট্রাসাউন্ড প্রোব। প্রচলিত বড় আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্রের তুলনায় এটি আকারে ছোট এবং রোগীর কাছাকাছি গিয়ে পরীক্ষা করার জন্য নকশা করা হয়েছে। যন্ত্রটির সঙ্গে যুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার পরীক্ষার সময় চিকিৎসককে ছবির মান যাচাই এবং প্রয়োজনীয় দৃশ্য ধারণে সহায়তা করে।
এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সুইপএআই। এক্সোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এটি যন্ত্রের ভেতরেই কাজ করতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার সময় ছবির মান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেয়। প্রোবটি শরীরের ওপর দিয়ে চালানোর সময় সফটওয়্যার উপযুক্ত ছবি শনাক্ত করতে এবং পর্যাপ্ত তথ্য ধারণ হয়েছে কি না, তা বুঝতে সহায়তা করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পরীক্ষার জন্য ক্লাউড বা ইন্টারনেট সংযোগের ওপর নির্ভর করতে হয় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে যন্ত্রটি নিজে থেকেই সব রোগের চূড়ান্ত নির্ণয় করে। এটি চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করার একটি প্রযুক্তি।
এক্সোর প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুধু ছবি তোলার মান যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, আইরিসে হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে সহায়ক এআই ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং ফুসফুসের চারপাশে তরল জমা বা ফুসফুসের কিছু অংশে অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে সহায়তা করা অন্তর্ভুক্ত। এসব তথ্য চিকিৎসকের প্রাথমিক মূল্যায়নে কাজে লাগতে পারে। তবে রোগীর উপসর্গ, অন্যান্য পরীক্ষার ফল এবং চিকিৎসকের সামগ্রিক মূল্যায়নের বিকল্প নয় এই প্রযুক্তি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এক্সো সুইপএআই চালুর ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদিত ব্যবহারের আওতায় হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় এই প্রযুক্তি সহায়তা করে। পরে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ফুসফুসে তরল জমা এবং ফুসফুসের টিস্যুতে ঘনত্ব বা ধসের মতো পরিবর্তন শনাক্তে সহায়ক এআই ব্যবস্থার জন্য এফডিএর ৫১০(কে) ছাড়পত্রের তথ্য প্রকাশিত হয়। একই বছরের জুনে এক্সো ফুসফুসের এসব বৈশিষ্ট্য শনাক্তে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আরও তথ্য জানায়। এ ধরনের নিয়ন্ত্রক ছাড়পত্র নির্দিষ্ট ব্যবহার ও নির্দিষ্ট প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একে সব ধরনের রোগ শনাক্তের সামগ্রিক অনুমোদন হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা স্বাস্থ্যসেবার একটি বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। বড় শহরের বাইরে অনেক এলাকায় উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র, প্রশিক্ষিত কর্মী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সুযোগ সীমিত। রোগীকে পরীক্ষা করাতে দূরের হাসপাতালে যেতে হলে সময় ও অর্থ দুটিই বেশি লাগে। বহনযোগ্য আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্র স্বাস্থ্যকর্মীদের রোগীর কাছাকাছি গিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা করতে সহায়তা করতে পারে। তবে বাস্তবে এর সুফল পেতে যন্ত্রের দাম, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা-তথ্যের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজন হলে রোগীকে উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এক্সোর প্রধান নির্বাহী সন্দীপ আকারাজু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের বৈঠকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পর এশিয়ায় প্রথম বাংলাদেশে প্রযুক্তিটি চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক লক্ষ্য বড় হাসপাতাল হলেও ভবিষ্যতে গ্রামীণ ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এর ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ সফল হলে দূরবর্তী এলাকায় প্রাথমিক পরীক্ষা সহজ হতে পারে। তবে কোন হাসপাতাল থেকে কার্যক্রম শুরু হবে, কতটি যন্ত্র আনা হবে, এর মূল্য কত হবে এবং সাধারণ রোগীরা কখন থেকে সেবা পাবেন, সে বিষয়ে ঘোষণার সময় বিস্তারিত সময়সূচি জানানো হয়নি।
ইউসুফ হকের কর্মজীবন দেখায়, চিকিৎসাপ্রযুক্তির উন্নয়নে শুধু চিকিৎসাবিদ্যা নয়, ইলেকট্রনিকস, চিপ নকশা, সফটওয়্যার ও প্রকৌশলের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বে এক্সো যে প্রযুক্তি তৈরি করছে, তা রোগ নির্ণয়ের কিছু ধাপকে সহজ ও দ্রুত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে এর ব্যবহার কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, ব্যয়, প্রশিক্ষণ এবং চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তিটির কার্যকর সংযোগের ওপর। আপাতত প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত পরিকল্পনা দেশের স্বাস্থ্যসেবায় বহনযোগ্য ও এআই-সহায়ক পরীক্ষাপদ্ধতি যুক্ত করার একটি সম্ভাব্য পথ সামনে এনেছে।
সূত্র: এক্সোর অফিসিয়াল প্রোফাইল ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রকাশনা; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর প্রতিবেদন।
