নিজস্ব প্রতিবেদক: শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীর একটি অংশ কাজ করছে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবভিত্তিক বিভিন্ন আলোচনায় এমন দাবি সামনে এসেছে। বিষয়টির সত্যতাও পাওয়া গেছে।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো পরিকল্পনা কি এগোচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ধারাবাহিক নিয়োগ, বদলি ও রদবদলকে ঘিরে নতুন করে শেখ হাসিনার ফেরার পথকে মসৃণ করছে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। সূত্র আরো দাবি করেছে, সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে এমন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যারা ভারতঘনিষ্ঠ বা ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে তারেক রহমানের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে সেনাবাহিনীর বৃহৎ একটি অংশই সেটির পক্ষে কাজ করবেন বলে জানা গেছে।
শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ও ভারতপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে যারা পরিচিত তাদেরকেই অনেকটা বাধ্য হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এনেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস), সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক পদে পরিবর্তন আনা হয়। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমানকে সিজিএস, মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানকে পদোন্নতি দিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও পিএসও এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরীকে পদোন্নতি দিয়ে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক করা হয়।
একই রদবদলে ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জে এম ইমদাদুল ইসলামকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট করা হয়। আর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসানকে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করা হয়। পাশাপাশি দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাফিজুর রহমানকে পদোন্নতি দিয়ে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করা হয়।
সেপ্টেম্বরেও সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে আরও রদবদলের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ৮ সেপ্টেম্বরের দুটি সেনাসদর আদেশে মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কর্নেল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার দায়িত্ব পরিবর্তন করা হয়। এসব পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল কমান্ড, গোয়েন্দা ও সদর দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদকে ঘিরে।
এই ধারাবাহিক পরিবর্তনই প্রশ্ন তুলেছে; সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এত রদবদলের পেছনে কি শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন, নাকি এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো হিসাবও রয়েছে? বিশেষ করে ডিজিএফআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পরিবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। তবে শুধু পদায়ন বা বদলির তথ্য থেকে কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর পরিকল্পনায় তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নির্দেশ দিয়েছেন; এমন দাবি করে ২০২৫ সালেও একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি বিভিন্ন পুরোনো ফুটেজ ও ভিন্ন বক্তব্য জুড়ে তৈরি করা হয়েছিল। সেনাপ্রধানকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো নির্দেশ দিতে দেখা যায়নি।
তবে এবার আর কোনো ভিডিও ছড়ায়নি। যা ঘটছে লোকচক্ষুর আড়ালেই ঘটছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই নিজেদের দেশপ্রেমিক মনে করেন। বাংলাদেশ বর্তমানে ভালো নেই। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির অবনতিসহ জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নতুন করে ডাক না দেয়া সেনাবাহিনীর নিচের স্তরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সিপাহীদের মধ্যেও মনোভাবে পরিবর্তন এসেছে। তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে সরাসরি অবস্থান ব্যক্ত না করলেও, চাইছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ফিরে আসুক এবং দেশের মানুষের পক্ষে অবস্থান নিক।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে সেনাবাহিনীর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য বলছে, বাহিনী সাংবিধানিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের ওপরই জোর দিচ্ছে।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটি মূলত রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিভিন্ন দাবি থাকলেও, সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো প্রকাশ্য সরকারি সিদ্ধান্ত বা সামরিক নির্দেশ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে বিশস্ত সূত্রের খবর, সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশই শেখ হাসিনার ফিরে আসার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
